ভারতের জুন মাসের মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বাজারের সব পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ভারতের অর্থনীতির চিত্র নয়; বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত কীভাবে দ্রুত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে, তার একটি আগাম সতর্কসংকেত।
চলতি বছরের শুরু থেকেই ভারতে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। জানুয়ারিতে তা ছিল ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, মার্চে ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং মে মাসে ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছানোর পর জুনে বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। একই সময়ে ইউরোজোনে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ২ শতাংশে উঠে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে, যদিও জুনে তা কিছুটা কমে ২ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) ২০২৬ সালের জন্য জি-২০ দেশগুলোর গড় মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করেছে। সংস্থাটি এর প্রধান কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয় এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেকই আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লেই জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত দেশগুলোর কৌশলগত তেল মজুত, বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা ও শক্তিশালী মুদ্রা থাকায় তারা কিছুটা সময় পায়। তবে এগুলো দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পারে না। ইউরোজোনে জুন মাসেও জ্বালানি মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থাকায় একই প্রবণতা ইতোমধ্যে সেখানে দেখা যাচ্ছে।
সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে যুদ্ধবিরতির ওপর ভিত্তি করে করা আগের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসগুলো এখন বাস্তবতার সঙ্গে আর পুরোপুরি মিলছে না।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৫ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানিনির্ভর উদীয়মান অর্থনীতিগুলো—যেমন তুরস্ক, ফিলিপাইন ও পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশ—একই ধরনের মূল্যচাপের মুখে পড়তে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক সংঘাতজনিত সরবরাহ সংকট সাধারণত সংঘাত কমে এলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন ধারণা এখন আর নিরাপদ নয়। ভারতের সাম্প্রতিক তথ্য বরং ইঙ্গিত দিচ্ছে, জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
















