দক্ষিণ সুদানের জংলেই অঙ্গরাজ্যে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, গ্রাম পোড়ানো এবং হাজার হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বাহিনী ও বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী উভয়ের বিরুদ্ধে হামলা ও ধ্বংসের অভিযোগ থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই দাবি করছেন, সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রার পরই তাদের এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে লানকিয়েন শহরে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে স্থানীয় হাসপাতাল থেকে রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা পরই হাসপাতালটিতে বোমা হামলা হয়। হাসপাতালের গুদাম ধ্বংস হয়ে যায় এবং পরে পুরো স্থাপনাটি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।
স্থানীয়দের বর্ণনায় জানা যায়, গোলাবর্ষণের পর তারা আশপাশের জলাভূমিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ফিরে এসে তারা দেখতে পান হাসপাতাল, বাজার ও বসতবাড়ির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা, পানির অবকাঠামো এবং চিকিৎসাসামগ্রীও নষ্ট করা হয়েছে।
চিকিৎসা সহায়তা প্রদানকারী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এলাকা পরিদর্শনের পর জানান, মানুষের জীবনধারণে সহায়ক প্রায় সবকিছুই ধ্বংস করা হয়েছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণকারী বিভিন্ন সংস্থার উপগ্রহচিত্র, যাচাই করা ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে দেখা গেছে, জানুয়ারির শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত জংলেইর বিস্তীর্ণ এলাকায় ধারাবাহিকভাবে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ঘরবাড়ি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজার ও মানবিক সহায়তা কেন্দ্রগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু গ্রাম প্রায় সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গেছে এবং হাজার হাজার মানুষ নিরাপত্তার খোঁজে জলাভূমি, বনাঞ্চল ও দূরবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে।
সরকারি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ প্রতিবেদনে উত্থাপিত নির্দিষ্ট অভিযোগের জবাব দেওয়া হয়নি। তবে পূর্বের বিবৃতিতে তারা দাবি করেছে, সামরিক অভিযান আত্মরক্ষার অংশ এবং বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় না।
বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিরোধী নেতা ও প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট রিয়েক মাচারকে গ্রেপ্তারের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও তার রাজনৈতিক জোট শান্তিচুক্তিকে অকার্যকর ঘোষণা করে এবং বিভিন্ন এলাকায় হামলা শুরু করে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সামরিক অভিযান জোরদার করে। বিরোধী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি পুনর্দখলের লক্ষ্যে বড় ধরনের পাল্টা অভিযান শুরু হয়। এতে সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অংশ নেয় বলে জানা গেছে।
লানকিয়েন থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গোলাবর্ষণের পর সাঁজোয়া যান নিয়ে সশস্ত্র বাহিনী শহরে প্রবেশ করে। এরপর বিভিন্ন এলাকায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। অনেক পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছে এবং ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
একজন বাসিন্দা জানান, তিনি যখন বাড়িতে ফিরে আসেন তখন তার স্ত্রীকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। আশপাশে আরও অনেক মরদেহ পড়ে ছিল। তার ভাষায়, পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
অন্য আরেক বাসিন্দা জানান, পালাতে না পারা তার বৃদ্ধ আত্মীয়কে খুঁজতে গিয়ে তিনি পুড়ে যাওয়া বাড়ির ধ্বংসাবশেষের পাশে কয়েকটি মরদেহ দেখতে পান।
শুধু লানকিয়েন নয়, নীল নদ থেকে ইথিওপিয়া সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বহু এলাকায় একই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিরোধী যোদ্ধারা এলাকা ছাড়ার পর সশস্ত্র বাহিনী এসে বাড়িঘর ও বাজারে আগুন দেয় এবং বিভিন্ন স্থাপনা লুটপাট করে।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, এর প্রভাব ভয়াবহ। চলতি বছরে অন্তত ২৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা লুটপাটের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কয়েকটি জেলায় দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ চরম খাদ্যসংকটের মুখে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, জংলেইর ঘটনাগুলো দেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস বেড়েছে এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থাও কমেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে দক্ষিণ সুদানে নতুন করে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
















