তানজানিয়ার রাজপথ এখনো যেন রক্তের দাগে ভারী। বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশজুড়ে যে রোষ ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই আগুন এখন আদালতের কাঠগড়ায়। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ডজনখানেক মানুষকে অভিযুক্ত করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বরাতে জানা গেছে, অন্তত ৭৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে তারা ২৯ অক্টোবরের নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। রয়টার্স জানিয়েছে, সংখ্যাটি আরও বেশি—প্রায় ১৪৫ জনকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ আছে।
এছাড়া অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে। যদিও নির্দিষ্টভাবে একজন ব্যবসায়ীর নাম চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে—অভিযোগ, তিনি বিক্ষোভের সময় মানুষকে তার দোকান থেকে টিয়ারগ্যাস প্রতিরোধী মাস্ক কিনতে উৎসাহিত করেছিলেন।
মানবাধিকার কর্মী এবং প্রধান বিরোধী দল চাডেমা দাবি করেছে, এই বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। সরকার এই সংখ্যা অস্বীকার করেছে, তবে নিজের পক্ষ থেকে কোনো পরিসংখ্যান দেয়নি।
নির্বাচনে প্রায় ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়ে নতুন প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসান সোমবার শপথ নিয়েছেন। তবে আফ্রিকান ইউনিয়ন জানিয়েছে, এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বলেছে, ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, ইন্টারনেট বন্ধ, অতিরিক্ত সামরিক বলপ্রয়োগ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপহরণের মতো ঘটনা নির্বাচনের সততা ক্ষুণ্ন করেছে।
দুই প্রধান বিরোধী প্রার্থীকে ভোটে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। চাডেমা নেতা টুন্ডু লিসু এখনো এপ্রিল থেকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় কারাগারে বন্দি।
এই অশান্ত সময়ে ধর্মীয় নেতারাও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা জনগণের সঙ্গে পুনর্মিলনের পথে হাঁটে। তানজানিয়ার ইভানজেলিকাল লুথেরান চার্চের বিশপ বেনসন বাগোনজা বলেছেন, সরকারের উচিত জনগণের বেদনার সঙ্গে সহমর্মিতা দেখানো, নতুন করে গ্রেপ্তার করে ঘৃণার আগুন না বাড়ানো।
তিনি বলেছেন, “এখন সরকারের একমাত্র দায়িত্ব হলো জনগণের শোকে শামিল হওয়া, তাদের বিচারসভায় টেনে নেওয়া নয়।”
শুক্রবার দেশটির লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সেন্টারসহ সাতটি বেসরকারি সংস্থা যৌথ বিবৃতিতে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর “অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও ঘরে ঘরে প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডের” নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, শত শত মানুষ আটক হয়েছে, বহু পরিবার ভেঙে গেছে, শিশুরা নিজের চোখে দেখেছে তাদের বাবা-মার ওপর সহিংসতা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের পূর্ণ চিত্র এখনো প্রকাশ পায়নি।
চাডেমার আঞ্চলিক সম্পাদক আমোস এনটোবি জানান, শুধু উত্তরাঞ্চলের মওয়ানজা এলাকাতেই শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা দিনের আলোয় মানুষকে গুলিতে মরতে দেখেছি। রাস্তাজুড়ে লাশ পড়ে ছিল—কেউ সেখানেই প্রাণ হারিয়েছে, কেউ কাতরাতে কাতরাতে পড়েছিল।”
২০২১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জন মাগুফুলির আকস্মিক মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন সামিয়া সুলুহু হাসান। তার নেতৃত্বে শুরুতে পরিবর্তনের আশা দেখা গেলেও, সাম্প্রতিক দমননীতিতে দেশজুড়ে শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ—তার প্রশাসনের হাতে ভিন্নমতাবলম্বীরা নিখোঁজ, কেউ কেউ নির্যাতনের শিকার।
তানজানিয়ার আকাশে এখনো শোকের কালো মেঘ। রাজনীতি, ধর্ম ও মানুষের বেদনা মিলেমিশে যেন এক অন্ধকার প্রতিধ্বনি তুলছে—স্বাধীনতার নামে বন্দিত্ব, আর ভোটের নামে নিঃশব্দ কান্না।
















