বাংলাদেশে ১৬ বছরের নিচের শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। বুলিং, সাইবার অপরাধসহ নানা ঝুঁকি শিশু ও তাদের অভিভাবকদের প্রভাবিত করছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে নিষেধাজ্ঞা, নাকি নিয়ন্ত্রণ কোনটি কার্যকর?
এই প্রেক্ষাপটে রোববার (০৩ মে) রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালে ‘১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞা: আইনি কাঠামো ও প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ডেইলি সান।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার চেয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর নজরদারিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।গোলটেবিলে শিক্ষক, আইনজীবী, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও বিশ্লেষকরা অংশ নেন। আলোচনা সঞ্চালনা করেন ডেইলি সানের এস এম শারমিন জাহান।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) মহাসচিব অ্যাডভোকেট ফাতেমা রশীদ হাসান বলেন, ভালো ও খারাপ দুটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যমান থাকলেও কম বয়সী শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বদলেন, ‘শিশুরা অনেক সময় এসব মাধ্যমে কেক বানানো, আঁকা বা রং ব্যবহার শেখে, যা ইতিবাচক দিক।তবে সমস্যা শুরু হয় যখন নারী ব্যবহারকারীরা অনলাইনে লক্ষ্যবস্তু হয় এবং যৌন হয়রানির শিকার হয়, যা আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত তৈরি করতে পারে।’
আইওই–ইউসিএল-এর ফ্যাকাল্টি অব এডুকেশন অ্যান্ড সোসাইটির প্রশিক্ষক ফিতরাত রশীদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এখন বৈশ্বিক আলোচনার অংশ।
তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও ইন্দোনেশিয়া এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। আরও কয়েকটি দেশ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি কোনো এক দেশের পরীক্ষা নয়, বরং বৈশ্বিক নীতিগত পুনর্বিবেচনা।’
তবে প্ল্যাটফর্মগুলোর বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অকার্যকর বলে মন্তব্য করে ফিতরাত রশীদ বলেন, ‘ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটক ১৩ বছরের নিচে ব্যবহার নিষিদ্ধ বললেও বাস্তবে তা কার্যকর নয়।’
শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ছোট শিশুদের মধ্যে মনোযোগ ঘাটতি (এডিএইচডি), বিলম্বিত ভাষা দক্ষতা ও সীমিত যোগাযোগ ক্ষমতার মতো সমস্যাও বাড়ছে, যার পেছনে অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহারের প্রভাব রয়েছে।
কেয়ার বাংলাদেশের সাবেক কর্মকর্তা টনি মাইকেল গোমেজ বলেন, ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত শিশু অধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘কেন ১৬ বছর নির্ধারণ করা হলো, এই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর নেই।’ একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দেশে সিম নিবন্ধন ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে কিছু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই রয়েছে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক তাসনিম এ. এমা বলেন, শিশুদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় এবং সেটি প্রয়োজনও নেই।
তিনি বলেন, ‘শিশুদের কনটেন্ট ভোক্তা ও নির্মাতা এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ বিকল্প সামাজিক পরিসর তৈরি না করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।’
তার মতে, নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে শিশুদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক কে এম এম আশফাক উল মুশফিক বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করলেও শিশুরা বিকল্প পথ খুঁজে নেবে।’
তিনি বলেন, ‘দোষ শিশুর নয়; বরং অনলাইন মন্তব্যগুলোই অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়। এসব মন্তব্য শিশু ও তাদের পরিবারের ওপর মানসিক প্রভাব ফেলে।’
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উপপরিচালক ড. রাহুল ম্যাথিউ বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা কার্যকর সমাধান নয়। একটি সহায়ক সামাজিক ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে কীভাবে নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়, সেটি শেখানো জরুরি।’
ডিজিটালি রাইট-এর গবেষণা প্রধান আবদুল্লাহ তিতির বলেন, দেশে বিদ্যমান আইনগুলো মূলত প্রতিক্রিয়াশীল।
তিনি বলেন, ‘ক্ষতি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ক্ষতিকর কনটেন্ট শিশুদের কাছে পৌঁছানোর আগেই প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে অ্যালগরিদমগুলোই ক্ষতিকর কনটেন্ট বেশি ছড়িয়ে দেয়।’
















