দেশে প্রতিমাসে ধারাবহিকভাবে বাড়ছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। গত ৩ মাসে সারা দেশে ৮৫৪ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুধু ঢাকাতেই ১০৭ হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কখনও মোটা অঙ্কের চাঁদা চেয়ে কখনোবা ব্যবসা ও অন্যান্য সম্পদ দখল নিতে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য হুমকি। পরবর্তীতে ঘটছে হত্যাকাণ্ড, এসব ঘটনার সূত্র ধরে হচ্ছে বিদেশে মোটা অঙ্কের টাকা পাচার। এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর অপতৎপরতায় অস্থির হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। জনমনে বিরাজ করছে ভীতি আতঙ্ক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জুলাই আগষ্ট গণঅভ্যুত্থানের পর কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তির ছত্রছাত্রায় জেল থেকে বের হয়ে চলে যায় বিদেশে। সেখানে বসেই স্থানীয় তার সহযোগী সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে চালায় রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব। তবে এমন পরিস্থিতিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
এই অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দফায় দফায় বৈঠক করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ইউনিট। সমন্বয় সভা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও। মঙ্গলবার ২১ এপ্রিল) আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। আর ফেরুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে খুন হয় ৩১৭টি। চলতি মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। এছাড়াও চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে ঢাকায় অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ-এই তিন মাসে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মার্চে ৩৩টি হত্যাকাণ্ড হয়। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ৩৮ এবং জানুয়ারিতে খুনের ঘটনা ঘটে ৩৬টি।
জামিনপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীদর মধ্যে সরকারের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী আছে অন্তত ছয়জন। জামিনে বেরিয়ে এসে যারা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। ইতোমধ্যে এসব সন্ত্রাসীর আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।ঢাকা গাইড
বিদেশে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে গত ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় কাফরুলে একেএম অ্যাপারেলস গার্মেন্ট কারখানায় প্রবেশ করে ১২ থেকে ১৩ জন সন্ত্রাসী। তারা প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করায় পিস্তল বের করে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। পরে অফিসের লকার ভাঙচুর করে। তিন দিনের মধ্যে চাঁদা না দিলে কারখানা মালিককে হত্যার হুমকি দেয়। সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার সময় সিসি ক্যামেরার ডিভিআর ও হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় এরই মধ্যে স্থানীয় চার সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমসংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন র্যাব-৪ এর মিডিয়া অফিসার কেএন রায় নিয়তি। তিনি জানান, গ্রেফতারকৃতরা সন্ত্রাসী বাহিনী ‘ফোর স্টার’ গ্রুপের সদস্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় গত জানুয়ারিতে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীদের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির। ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী গত বছরের সেপ্টেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থকে মুক্তি পান। জামিন পাওয়ার ১২ দিনের মধ্যেই তিনি দুবাই হয়ে চলে যান সুইডেনে। সেখানে বসেই তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অপরাধ জগত। তার বিরুদ্ধে ২২টি মামলা ছিল। যার মধ্যে হত্যা মামলা ৯টি। বেশ কয়েকটি মামলায় সাজাও হয় তার। এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় ১৭ বছরের জেলও হয়।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিন পাওয়া সন্ত্রাসীদের অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে দেশে ফিরেছে। অনেকেই চেষ্টা চালাচ্ছে দেশে ফেরার। কেউ কেউ কারাগারে বসেই নির্দেশনা দিচ্ছে দেশকে অস্থিতিশীল করার। রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নাম উঠে এসেছে পিচ্চি হেলালের। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, এলিফ্যান্ট রোডসহ আশপাশের এলাকার অপরাধজগতে পিচ্চি হেলালের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইমন।
এলিফ্যান্ট রোডের বিপনিবিতান মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় ইমনের লোকজন জড়িত বলে জানা গেছে। জামিন পওয়ার পর ইমন থাইল্যান্ড চলে গেলেও তার অপতৎপরতা থেমে নেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছেন। দুই-একজন কারাগারে আছেন। বাকিরা বিদেশে অবস্থান করে দেশের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রাজধানীর অন্যান্য স্থানের তুলনায় হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা বেশি ঘটছে মোহাম্মদপুরে। গত ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় আসাদুল হক নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এর দুইদিন আগে ১২ এপ্রিল বিকালে মোহাম্মদপুরে রায়ের বাজার এলাকায় ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন নামের এক সন্ত্রাসীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ রকম চিত্র শুধু মোহাম্মদপুরেই নয়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ইশারায় নগর জুড়েই তৎপর কিলাররা।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত নভেম্বরে রাজধানীর পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দুইটি গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি উঠে এসেছে। নিহত তারিক সাইফ মামুন রাজধানীর তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। একসময় তিনি ইমনের সহযোগী ছিলেন। পরে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। এই হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের নামও। ১৯৯৭ সালে মোহাম্মদপুরে জোসেফের ভাই টিপু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন মামুন। সেই ক্ষোভ থেকে জোসেফের টার্গেটে ছিল মামুন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি, মিডিয়া) এএইচ এম শাহাদাৎ হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যারাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত-তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। এজন্য পুলিশের নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’
তিনি জানান, ‘জামিনপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীদের বিষয়েও আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে তাদের কোনো ভূমিকা আছে কিনা-সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
















