নির্বাচনে সহযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘে চিঠি
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ‘অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নয়’ এমন নির্বাচনে ইউএনডিপির সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের ম্যান্ডেট লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে দাবি তাদের।
ঢাকা, ০৫ নভেম্বর ২০২৫:
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং বর্তমানে কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা আওয়ামী লীগ এবার বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নয়’ এমন নির্বাচনে সহযোগিতা প্রদান থেকে বিরত থাকতে জাতিসংঘের প্রতি আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছে।
দলের পক্ষে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল শনিবার (০২ নভেম্বর) ঢাকায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রতিনিধি স্টেফান লিলার-এর কাছে এই চিঠি পাঠান।
মূল দাবি ও উদ্বেগ:
চিঠিতে আওয়ামী লীগ মূলত দুটি বিষয়ে জোর দিয়েছে:
১. নির্বাচনী সহযোগিতা স্থগিত: “অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা জাতিসংঘ এবং ইউএনডিপির প্রতি নির্বাচনি সহযোগিতা স্থগিতের আহ্বান জানাচ্ছি।”
২. জাতীয় সংলাপ উৎসাহিতকরণ: সব রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে জাতীয় সংলাপ ও সমঝোতাকে উৎসাহিত করা এবং যে কোনো নির্বাচনি সম্পৃক্ততার মূলভিত্তি হিসাবে মানবাধিকার ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ‘বাংলাদেশে ইউএনডিপির নির্বাচনি সহযোগিতা এবং জাতিসংঘ সনদের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং মৌলিক অধিকারের মূলনীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ’ শীর্ষক শিরোনামের চিঠিতে উল্লেখ করে:
“এই ধরনের সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের মূলনীতি এবং অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রসারের ক্ষেত্রে ইউএনডিপির ম্যান্ডেট লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে।”
তিন বিতর্কিত নির্বাচনের প্রেক্ষাপট:
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে টানা দেড় দশক দেশ শাসন করা আওয়ামী লীগ নিজেই তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার অভিযোগের সম্মুখীন।
| নির্বাচন | সাল | বিতর্ক/পর্যবেক্ষণ |
| দশম জাতীয় নির্বাচন | ২০১৪ | নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপি ও বেশিরভাগ বিরোধী দলের বর্জন। ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী আওয়ামী লীগ। পরিচিতি পায় ‘বিনা ভোটের সংসদ’ হিসেবে। |
| একাদশ জাতীয় নির্বাচন | ২০১৮ | জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ, ‘আগের রাতে ভোট’ হওয়ার অভিযোগ। পরিচিতি পায় ‘নীশিরাতের নির্বাচন’ হিসেবে। |
| দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন | ২০২৪ | বিএনপি ও সমমনাদের বর্জন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও দলীয় বিদ্রোহীদের মধ্যে। পরিচিতি পায় ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচন হিসেবে। |
হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ গত ডিসেম্বরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আংশিক বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানোর পথ তৈরি করে এবং পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করে যে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিন জাতীয় নির্বাচনে ‘জনগণের আস্থা ধ্বংস করা হয়েছে’।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের উদ্বেগ:
জাতিসংঘকে লেখা চিঠিতে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে ‘নিবর্তনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ’ বিরাজ করছে বলে দাবি করেছে। তারা বলেছে:
- হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী আটক বা হুমকির মুখে।
- রাজনৈতিক সংলাপ বা ঐকমত্যের সুযোগ ভেঙে পড়েছে।
- দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থান হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যরাও সক্রিয়ভাবে প্রচার করছেন।
দলের পক্ষ থেকে ইউএনডিপির ভূমিকাকে ‘জরুরিভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়ন’-এর আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তাদের সমর্থন কাউকে বাদ দেওয়া বা নির্যাতনের কারণ না হয়।
জাতিসংঘের সাবেক সমন্বয়কের মন্তব্য:
গত জুনে ঢাকায় সদ্য বিদায়ী জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইসকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,
‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচন বলতে তিনি বোঝান সমাজের প্রত্যেক অংশের যেন ভোট দেওয়ার প্রবেশাধিকার ও সক্ষমতা থাকে এটি কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের বিষয় নয়।
পরবর্তী পদক্ষেপ:
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে ইউএনডিপির প্রতিনিধি স্টেফান লিলার এবং সংস্থার মুখপাত্রের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইমেইল পাঠানো হলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
















