ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৮০ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আজকের পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
১৯৮০ সালে ইরাকের তৎকালীন নেতা সাদ্দাম হোসেন বিশ্বাস করেছিলেন, সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের জনগণ সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমে পড়বে এবং শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে এর বিপরীত ঘটেছিল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের সাধারণ মানুষ, এমনকি সরকারবিরোধী অনেক গোষ্ঠীও দেশের প্রতিরক্ষায় একত্রিত হয়। ফলে সরকার আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বিরোধীদের দমন করে ক্ষমতা সুসংহত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একই ধরনের ভুল ধারণা পোষণ করছেন। তারা মনে করছেন, সামরিক হামলা ইরানের জনগণকে সরকারবিরোধী করে তুলবে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। ইরানে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও বিদেশি হামলা সেই অসন্তোষকে সরকার পতনের দিকে ঠেলে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং ইতিহাস বলছে, বাহ্যিক আক্রমণ দেশের অভ্যন্তরে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলে এবং জনগণ রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়। এতে সরকার আরও কঠোর অবস্থান নেয় এবং দমন-পীড়ন বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শুধুমাত্র বিমান হামলার মাধ্যমে পরিচালিত যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। এতে সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছাড়াও বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ায়।
এ ধরনের হামলা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে পার্থক্যকে ঝাপসা করে দেয়। ফলে জনগণ নিজেদের সমস্যার জন্য সরকার নয়, বরং আক্রমণকারী শক্তিকেই দায়ী করে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরানের শাসনব্যবস্থা একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বিভিন্ন ক্ষমতার কাঠামোর সমন্বয়ে গঠিত। তাই নেতৃত্বে আঘাত হানলেই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এ ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
এছাড়া যুদ্ধের মাধ্যমে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা অতীতে সফল হয়নি। ইরান-ইরাক যুদ্ধেও একই কৌশল ব্যর্থ হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করলে তা উল্টো রাষ্ট্রকে আরও সামরিকীকরণ ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে—বাহ্যিক শক্তির সামরিক চাপ দিয়ে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা কঠিন, বরং তা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও মানবিক সংকট বাড়িয়ে দিতে পারে।
















