ভারতের আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে পারেননি তদন্তকারীরা। বিশ্বের অন্যতম আধুনিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটির মাত্র ৩২ সেকেন্ডের মধ্যে আকাশ থেকে ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা এখনো রহস্যে ঘেরা।
দুর্ঘটনায় ২৬০ জনের প্রাণহানি ঘটে। প্রথম বার্ষিকীতে প্রকাশিত তদন্ত অগ্রগতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উড্ডয়নসংক্রান্ত তথ্য, বিমানব্যবস্থা, ইঞ্জিনের উপাদান, রক্ষণাবেক্ষণ নথি এবং মানবিক বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণ এখনো চলমান রয়েছে। তবে নতুন কোনো নির্দিষ্ট কারণ সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ড পর বিমানের দুটি ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারী সুইচ হঠাৎ বন্ধ অবস্থায় চলে যায়। ফলে উভয় ইঞ্জিন জ্বালানিশূন্য হয়ে সম্পূর্ণ শক্তি হারায়।
তবে এক বছর পরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
প্রথম প্রশ্ন হলো, চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশে এত বিলম্ব কেন হচ্ছে। বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দুর্ঘটনার কারণ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়ে যেত, তাহলে এতদিনে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘসূত্রতা ইঙ্গিত করছে যে তদন্তকারীরা এখনো একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি ঘিরে রয়েছে তদন্তকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ককপিটে থাকা দুই পাইলটের কথোপকথনের একটি অংশ উঠে আসে, যেখানে একজন অন্যজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেন তিনি সুইচ বন্ধ করেছেন। উত্তরে অন্যজন তা অস্বীকার করেন। এই তথ্য প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলে পাইলটদের দায় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে পাইলট সংগঠনগুলো বলছে, পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই ককপিটের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় প্রশ্ন হলো, জ্বালানি নিয়ন্ত্রণকারী সুইচগুলোই কি দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল, নাকি পাইলটরা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছিলেন। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ইঞ্জিনে আগে থেকেই সমস্যা দেখা দিলে পাইলটরা জরুরি পদ্ধতি অনুসরণ করে ইঞ্জিন পুনরায় চালুর চেষ্টা করে থাকতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সুইচের অবস্থান পরিবর্তন দুর্ঘটনার কারণ নয়, বরং সংকট মোকাবিলার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।
চতুর্থ প্রশ্নটি জরুরি শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঘিরে। প্রাথমিক প্রতিবেদিতে উল্লেখ করা হয়, উভয় ইঞ্জিন শক্তি হারানোর অল্প সময়ের মধ্যেই জরুরি টারবাইন সক্রিয় হয়। কিন্তু কিছু বিশ্লেষকের মতে, সময়ের হিসাব অনুযায়ী এটি আরও আগে সক্রিয় হওয়ার কথা ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ইঞ্জিন শক্তি হারানোর আগেই কি অন্য কোনো সমস্যা শুরু হয়েছিল?
পঞ্চম প্রশ্ন হলো, বিমানটিতে কোনো বড় ধরনের বৈদ্যুতিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল কি না। কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক ধারণা করছেন, উড্ডয়নের পর বিমানের কম্পিউটার ব্যবস্থায় সাময়িক ত্রুটি দেখা দিলে সেটি ভুলভাবে ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। যদিও এই তত্ত্বের পক্ষে এখনো কোনো সরকারি প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
ষষ্ঠ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ইঞ্জিনকে ঘিরে। উভয় ইঞ্জিনই দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হলেও এখনো কার্যক্ষমতার নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল। তবুও তদন্তকারীরা এখনো ইঞ্জিনের তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঞ্জিনের তাপমাত্রা ও কর্মক্ষমতার তথ্য বিশ্লেষণ করে বোঝা যেতে পারে, শক্তি হারানোর ঘটনা সুইচ বন্ধ হওয়ার আগে শুরু হয়েছিল নাকি পরে।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ককপিটের পূর্ণাঙ্গ অডিও রেকর্ড। এখন পর্যন্ত যে অংশ প্রকাশ করা হয়েছে তা দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুরো কথোপকথন এবং উড্ডয়নের শেষ মুহূর্তের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হলে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্ঘটনা শুধু একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নয়; এটি আধুনিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। এক বছর পরও উত্তরহীন প্রশ্নগুলোর কারণে নিহতদের পরিবার, বিমান চলাচল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং সাধারণ মানুষ এখনো চূড়ান্ত সত্য জানার অপেক্ষায় রয়েছেন।
















