ফরিদপুরে এ বছর পেঁয়াজের দাম নিম্নমুখী। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে মিলছে না এক কেজি ইলিশ মাছ। তবে একই পরিমাণ পেঁয়াজ বিক্রির টাকায় মিলছে এক কেজি গরুর মাংস।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুর। জেলায় এ বছর ৪৭ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। পেঁয়াজের দাম নিম্নমুখী হওয়ায় চাষিদের মাঝে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জেলার বিভিন্ন স্থানের হাট-বাজারে খোঁজ নিয়ে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ফরিদপুর জেলায় গতবছরের সাত হাজার হেক্টর বেশি জমিতে হালি পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এ বছর ৪৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৬ লাখ ৮২ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে।
ফরিদপুরের নগরকান্দা, সালথা উপজেলা ‘পেঁয়াজের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। সালথা সদর বাজার, ঠেনঠেনিয়া, বালিয়া, মাঝারদিয়া, নকুলহাটি, ফুলবাড়িয়া, সোনাপুরসহ বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা যায়, চলতি সপ্তাহে এক মণ (৪২ কেজি) ভালো মানের পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
অথচ বাজারগুলোতে ছোট্ট সাইজের ইলিশ (২-৪টায় কেজি) ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৩শ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে একজন কৃষক এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি ইলিশ কিনতে পারছেন না।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি পেঁয়াজ মৌসুমে সালথা উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১১ হাজার ২৫০ হেক্টর। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এবার ১১ হাজার ৫০০ হেক্টরে পৌঁছেছে। মুড়িকাটা ২০০ ও বীজ পেঁয়াজ ৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। সবমিলিয়ে চলতি মৌসুমে উপজেলায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এলাকায় এখন হালি পেঁয়াজ উত্তোলন শুরু হয়েছে। অনেকেই আবার অগ্রিম পেঁয়াজ উত্তোলন করছেন।
বোয়ালমারীর বাসিন্দা পেঁয়াজ চাষি রেজাউল করিম বলেন, বাজারে বিভিন্ন সাইজের এক কেজি ইলিশের দাম ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৩শ টাকা। গতকাল সহস্রাইল বাজারে এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি ইলিশ কিনতে গিয়ে দেখি টাকায় হয় না। তাই এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে ইলিশ না কিনে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।
উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরা জানান, চলতি মৌসুমে গতবছরের তুলনায় বেশি পরিমাণে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। ডিলাররা সিন্ডিকেট করে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এতে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে। তাছাড়া বীজ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এসব কারণে মণপ্রতি কৃষকের খরচ হয়েছে ৮শ থেকে ১ হাজার ২শ টাকা। মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে পেঁয়াজের দাম মনপ্রতি ১ হাজার ৫শ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা রাখার দাবি জানান তারা।
হতাশা প্রকাশ করে পেঁয়াজ চাষি আকরাম মোল্লা বলেন, মৌসুমের মাঝামাঝি থেকে শেষ সময়ে পেঁয়াজ চলে যায় মজুতদারের হাতে। তখন দাম বাড়লে কৃষকের কোনো উপকার হয় না। পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাবে পেঁয়াজ মজুত করা যায় না। বীজের অতিরিক্ত দামের কারণেও অনেকেই চারা উৎপাদন করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে উচ্চমূল্যে তাদের হালি পেঁয়াজ কিনে রোপণ করতে হয়। পরিবহণের কারণে অনেক সময় হালি পেঁয়াজ নষ্ট হয়, উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ে। ফড়িয়া ও ব্যাপারীরাও পেঁয়াজ চাষিদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন। এমন চলতে থাকলে পেঁয়াজ চাষে কৃষকরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
সালথা বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী এরশাদ মোল্যা বলেন, বাজারে পেঁয়াজের আমদানি প্রচুর। এজন্য আড়ত থেকে বাজার সব জায়গায় দাম কম। তাছাড়া অপরিপক্ক, কাটা ও ফাটা পেঁয়াজের বাজারে দাম কম থাকে। ঈদের পর ঢাকার আড়ত খুলছে। কিছুদিন পর হয়তো দাম বাড়বে।
সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদর্শন সিকদার বলেন, চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ চাষ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। পেঁয়াজের দাম নিয়ে চাষিদের মাঝে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। আশা করছি কৃষক পেঁয়াজের সঠিক দাম পাবে। একই সঙ্গে প্রণোদনা বাড়ানোর পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণাগারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলে তিনি জানান।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহে ভারসাম্য না থাকায় পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। কৃষকের ক্ষতি কমাতে সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি, বাজার তদারকি এবং ন্যয্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।
















