আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মাইলেইর দল লা লিবার্টাদ আভাঞ্জা আশ্চর্যজনকভাবে বিজয় অর্জন করেছে, যেখানে তারা ৪০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছে বলে প্রাথমিক ফলাফল জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। দেশটির নিম্নকক্ষের অর্ধেক আসন এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এই নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেই ঘোষণা করেছিলেন, ওয়াশিংটন থেকে বুয়েনোস আইরেসকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা কেবল নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প এই ফলাফলকে নিজের বিজয় বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “মাইলেই আমাদের অনেক সাহায্য পেয়েছেন, অনেক সাহায্য।”
নির্বাচনের আগে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যখাত ও অন্যান্য সামাজিক ব্যয় কমানোর মাঝেই তিনি আর্জেন্টিনার “এক মহান দর্শনকে” এগিয়ে নিতে এই সহায়তা দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও মন্তব্য করেন, “আমরা আর্জেন্টিনাকে আবার মহান দেখতে চাই।”
এভাবেই যেন দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে “মেক আর্জেন্টিনা গ্রেট অ্যাগেইন” ধ্বনি উঠেছে।
তবে ইতিহাসের কোন সময়টিতে আর্জেন্টিনা সত্যিই “মহান” ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেকের মতে, মার্কিন সমর্থিত ডার্টি ওয়ারের সময়টিই সেই “গৌরবের যুগ”, যখন এক সামরিক জান্তা হাজারো বামপন্থী সন্দেহভাজনকে হত্যা করে বা নিখোঁজ করেছিল।
এখন ট্রাম্প নতুন করে আর্জেন্টিনায় মার্কিন প্রভাব বাড়ানোর পথে। যদিও আজ আর বিমান থেকে মানুষ ফেলে দেওয়া হয় না, ডানপন্থী কঠোরতার চিহ্ন কিন্তু এখনো রয়ে গেছে।
২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসা মাইলেই নিজেকে “অ্যানার্কো-ক্যাপিটালিস্ট” হিসেবে পরিচয় দেন। নির্বাচনী সমাবেশে হাতে করাত নিয়ে বক্তৃতা করা তার রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, যা সরকারি ব্যয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশন কমানোর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তার শাসনের প্রথম ছয় মাসেই দারিদ্র্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ শতাংশে। যদিও মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং অধিকাংশ আর্জেন্টাইন এখন মাসিক খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
এই নির্বাচনী বিজয় মাইলেইর “চেইনসো নীতি” অব্যাহত রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর আগে তার দল সংসদে মাত্র ১৫ শতাংশ আসন পেত, ফলে বিরোধীদল তার ভেটো বাতিল করে সামাজিক সুবিধা ও শিশুস্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ পুনঃপ্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারত।
ট্রাম্প মাইলেইর নীতিকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে বলেন, “সবাই জানে, সে সঠিক কাজ করছে। কিন্তু একদল বিপজ্জনক চরম-বামপন্থী অসুস্থ সংস্কৃতি তাকে খারাপ দেখাতে চাচ্ছে।”
আর্জেন্টিনায় প্রতিবাদকারীদের ওপর রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপে বহু আহত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় আন্দোলনকারীরাও ছিলেন। গত মার্চে ৩৩ বছর বয়সী জনাথন নাভারো এমন এক প্রতিবাদে চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টি হারান।
এদিকে ট্রাম্পও মাইলেইর কঠোর অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল। সাম্প্রতিক এক কথোপকথনে তিনি রসিকতা করে বলেন, “তোমার বিরোধীদের জন্য কিছু টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দরকার হতে পারে।”
দুজনই ইসরায়েল ইস্যুতেও একমত। আগস্টে মাইলেই লাতিন আমেরিকা ও ইসরায়েলের সম্পর্ক জোরদারে ১ মিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
মাইলেই তার বোন কারিনা মাইলেইকে রাষ্ট্রপতির দপ্তরের সচিব নিযুক্ত করে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া অডিওতে জানা যায়, ওষুধ সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তিতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
তবুও নির্বাচনের এই ফলাফল তার সরকারকে নতুন শক্তি দিয়েছে। দারিদ্র্যপীড়িত আর্জেন্টাইনদের সামনে ভবিষ্যৎ হয়তো আরও কঠিন, কিন্তু ওয়াশিংটন স্পষ্টতই লাভবান হয়েছে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প বলেন, “আমরা এই নির্বাচনের পর অনেক অর্থ উপার্জন করেছি, কারণ তাদের বন্ডের মান বেড়েছে, ঋণমান উন্নত হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা টাকার জন্য করছি না।” কিন্তু ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা যখনই “মহান” হয়েছে, তখন কেউ না কেউ সেই মুনাফার অংশীদার থেকেছে।
















