ইভিএম প্রকল্পে বাজারদরের চেয়ে ১০ গুণ বেশি দামে মেশিন কিনে রাষ্ট্রের ৩,১৭২ কোটি টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া এড়িয়ে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে নিম্নমানের অকেজো যন্ত্রাংশ কিনে প্রকল্পটিকে ‘ডিজিটাল আবর্জনা’য় পরিণত করা হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই লুটপাটের সাথে জড়িত তৎকালীন সরকারের উচ্চপদস্থদের বিচার ও জবাবদিহিতা এখন সময়ের দাবি।
একটি দেশের নির্বাচনব্যবস্থা টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাস আর স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার ওপর। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উন্নয়ন আর আধুনিকতার নামে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) প্রকল্পে যে অনিয়ম ও অপচয়ের আস্তানা গড়ে তোলা হয়েছিল, তা এখন পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে সামনে আসছে। প্রযুক্তির আড়ালে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ লুটে নিয়ে গণতন্ত্রকে বানানো হয়েছে এক ধরনের প্রহসন।
৩ হাজার কোটি টাকার হরিলুট
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় লাখ ইভিএম মেশিন কেনার জন্য ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে এই মেশিনগুলো কেনা হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রের প্রায় ৩ হাজার ১৭২ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের একটি সুসংগঠিত চিত্র।
টেন্ডার ছাড়াই কেনাকাটা
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বড় প্রযুক্তিগত প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্র বাধ্যতামূলক হলেও, ইভিএমের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। টেন্ডার প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনাকাটা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহের কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে এই অস্বচ্ছ বাণিজ্যিক লেনদেনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা সরাসরি স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই লুটপাটের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, এনআইডি অনুবিভাগের তৎকালীন ডিজি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, বিএমটিএফ-এর তৎকালীন এমডি এবং নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন সচিব ও কমিশনারদের নাম এই সিন্ডিকেটে উঠে এসেছে। এটি কোনো সাধারণ দুর্নীতি নয়, বরং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের সমন্বিত একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ’।
অকেজো ‘ডিজিটাল আবর্জনা’
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এই মেশিনের বড় অংশই এখন অচল। দেড় লাখ মেশিনের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার ব্যবহারের উপযোগী। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে দেখা গেছে, প্রতি তিনটি মেশিনের একটি ত্রুটিপূর্ণ। ১০ বছরের ওয়ারেন্টির সুপারিশ থাকলেও নেওয়া হয়েছে মাত্র এক বছরের ওয়ারেন্টি, যা প্রমাণ করে যে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি সেবা নয় বরং দ্রুত বিল উত্তোলন ও কমিশন ভোগ করাই ছিল আসল উদ্দেশ্য।
বিতর্কিত ইভিএম প্রকল্পে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লুটপাটের অভিযোগ। ১০ গুণ বেশি দামে মেশিন কিনে রাষ্ট্রীয় অর্থের হরিলুট এবং নেপথ্যের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন।
















