দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের মাতারবাড়ি উপকূলে সমুদ্রের নোনা হাওয়া এখন আর শুধু জীবনের সুবাস বয়ে আনে না—সঙ্গে আসে কয়লা আর গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া, ধুলা ও বেদনা। এই বেদনার গল্পই ক্যামেরায় বন্দি করেছেন বাংলাদেশি আলোকচিত্রী নূর আলম। তাঁর ফটোপ্রদর্শনী “বাংলাদেশ: হোয়্যার দ্য স্মোক মিটস দ্য সি” নভেম্বরে টোকিওতে প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে—যেখানে সমুদ্রতীরের মানুষের জীবন, লড়াই আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন ফুটে উঠেছে হৃদয়ের ভাষায়।
মাতারবাড়ি, মহেশখালী, কহেলিয়া নদীর তীরে একসময় জালে মাছ ধরা, পানে বরজে কাজ, লবণ মাঠে ঘাম ঝরানো ছিল জীবনের রোজকার রুটিন। এখন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আর এলএনজি টার্মিনাল। নূর আলমের ছবিগুলো যেন এক নীরব চিৎকার—যেখানে ধোঁয়া আর সাগর মিলে গেছে টিকে থাকার যুদ্ধের প্রতীকে।
চট্টগ্রাম বিভাগে মানুষ একসময়ে বৃহৎ কয়লাভিত্তিক প্রকল্প ঠেকাতে পেরেছিল, কিন্তু এখন বিদেশি স্বার্থের চাপে নতুন করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ শুরু হয়েছে। মার্কেট ফোর্সেস-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই এলএনজি প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হবে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার—যা শুধু দেশের অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করবে না, বরং কোটি মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর ফেলবে ভয়াবহ প্রভাব।
এই বিপুল অর্থের ৩৬ বিলিয়ন ডলার যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা যেত, বাংলাদেশ পেতে পারত ৬২ গিগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ—যা দেশের বর্তমান উৎপাদনক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—বিদ্যুতের বিল বাড়ছে, গরমের তাপমাত্রা ভয়াবহ হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ হারাচ্ছে তাদের ভূমি, ঘরবাড়ি ও জীবনযাপন।
কহেলিয়া নদীর তীরে কাঁকড়া শিকারি আরিন এখন কাজ হারিয়েছেন, কারণ নদী ভরাট হয়ে গেছে বালু, মাটি আর শিল্পাঞ্চলের বর্জ্যে। এক সময়কার জীবন্ত নদী এখন মৃতপ্রায়, তার সঙ্গে মরে যাচ্ছে হাজারো জেলেপরিবারের জীবিকা।
মহেশখালীর কালামারছড়ায় পানচাষি আব্দুল্লাহ হারিয়েছেন তাঁর পূর্বপুরুষের জমি। “এক সময় পানের বরজে কাজ করতাম, এখন দিনমজুর হয়ে বেঁচে আছি,” বললেন তিনি, চোখে ক্লান্ত নোনাজল।
মাতারবাড়ির মোনাজা বেগমের কণ্ঠে ক্ষোভ, “আমাদের ঘরবাড়ি, গাছ, জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। কিন্তু কিছুই দেয়নি। আমরা যেতে চাইনি। তারপর তারা বুলডোজার পাঠাল—সব ভেঙে দিল।”
কৃষক মোহাম্মদ বেলাল বলেন, “আমাদের জমি ছিল জীবনের একমাত্র ভরসা। এখন তা নেই। দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের টাকা লুটে নিয়েছে দালালরা।”
ছোট্ট এক পুনর্বাসন এলাকায় এখন ৪৪টি পরিবার গাদাগাদি করে থাকে। শিশুদের খেলার জায়গা নেই, শুধু ধোঁয়ার ছায়া আর কালো ধুলোর আচ্ছাদন।
তবুও এই অন্ধকারের ভেতর কিছু নারী লিখছেন নতুন লড়াইয়ের ইতিহাস। উম্মে হাফসা খানম, যিনি সব হারিয়ে এখন কাপড় ও কারুশিল্পের ব্যবসা শুরু করেছেন, বলেন, “হারিয়েছি অনেক কিছু, কিন্তু হাল ছাড়িনি।”
লবণ শ্রমিক বিহান এখন আর নিজের জমিতে কাজ করেন না। কয়লাভিত্তিক প্রকল্প তাঁর মাঠ গিলে নিয়েছে। ক্ষতিপূরণও পাননি। তবু তিনি হার মানেননি—“আমরা লবণের মানুষ, লড়াই ছাড়া বাঁচতে পারব না,” বলেন তিনি।
জেলে মেহেদি হাসান গত মাসে বজ্রপাতে মারা গেছেন। বৃষ্টির মৌসুমে মাছ ধরতেন, শীতে লবণ তৈরি করতেন। তাঁর মৃত্যু যেন ইঙ্গিত দেয়—জলবায়ুর অস্থিরতা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠছে বাংলাদেশের উপকূলে।
রজিয়া বেগমের ঘর তিনবার ভেঙেছে, একবার বালুর স্রোতে ভেসে গেছে। এখন তিনি সৌরশক্তিতে চালিত ছোট্ট এক ঘর তৈরি করছেন। “আমার ছাগল আর বাচ্চারাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে,” বলেন তিনি, চোখে আশার আলো।
মাতারবাড়ি এখন যেন এক প্রতীক—যেখানে উন্নয়নের নামে মুছে যাচ্ছে মানুষের মুখ, আর সাগরের গন্ধে মিশে যাচ্ছে কয়লার ধোঁয়া। তবু সেই ধোঁয়ার ভেতরেই মানুষ খুঁজে ফিরছে জীবনের আলো।
















