হাওরাঞ্চচলের নারীদের গৃহস্থালি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুপেয় পানির সংকট; জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা ১১টি অঞ্চলে অভিযোজন জরুরি
সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের তীরবর্তী লালপুর গ্রামের রমিলা বেগম (৫১) যখন কাঁখে কলসি আর হাতে জগ নিয়ে ডোবা থেকে পানি বয়ে আনেন, তখন তাঁর চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার ছবি। ২০২৬ সালের বিশ্ব পানি দিবসের স্লোগান ‘পানির প্রবাহ যেখানে, সাম্যের হাসি সেখানে’ নির্ধারিত হলেও, রমিলা বেগমের মতো অসংখ্য নারীর জীবনে সাম্যের সেই হাসি আজও অধরা। ঘরে নয়জন মানুষের বিশাল সংসার, অথচ চার বছর আগে অনেক কষ্টে বসানো নলকূপটি এখন অকেজো। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় হাতে চাপা নলকূপে পানি উঠছে না, আর গভীর নলকূপ বসানোর আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই। ফলে তীব্র গরমে পুরুষেরা হাওরের ডোবায় গিয়ে গোসল সারতে পারলেও, সামাজিক বিধিনিষেধ ও পর্দার কারণে নারীদের নির্ভর করতে হচ্ছে দূর থেকে বয়ে আনা অনিরাপদ পানির ওপর।
রমিলা বেগমের এই ব্যক্তিগত লড়াই মূলত বাংলাদেশের জলবায়ু-সংকটাপন্ন এলাকার বৃহত্তর চিত্র। সরকারের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি-২০২৩-২০৫০) অনুযায়ী, দেশের ১১টি অঞ্চলকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইবারগঞ্জ ও নওগাঁর পাশাপাশি চট্টগ্রামের পটিয়ার মতো এলাকাগুলোকে ‘অতি উচ্চ’ পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের কম অংশগ্রহণের কারণে পানিসংক্রান্ত সমস্যায় নারী ও মেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রমিলা বেগমের আক্ষেপ, “বয়স অইছে, নিজেই কষ্ট করি তিন বেলা পানি আনি। ঘরের বউরে তো আর হাওরো পানির লাগি পাঠাইতাম পারি না, মাইনষে কিতা কইব।” এই সামাজিক সীমাবদ্ধতা আর অবকাঠামোগত অভাব নারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপের পাহাড় তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে হলে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীদের নেতৃত্ব ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। রমিলা বেগমের মেজ ছেলে শেখরুল ইসলামের কথায় ফুটে উঠেছে এক রূঢ় বাস্তবতা—”পানির মাঝে থাকি, আবার পানির লাগি কষ্ট করি।” হাওরাঞ্চলে বর্ষায় চারদিকে পানি থাকলেও শুকনা মৌসুমে সুপেয় পানির হাহাকার গ্রামবাসীর নিত্যসঙ্গী। এনএপি পরিকল্পনায় থাকা আটটি প্রধান খাতের অভিযোজন কার্যক্রম যদি দ্রুত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত না হয়, তবে এই পানিসংকট কেবল রমিলা বেগমদের ব্যক্তিগত কষ্ট নয়, বরং জাতীয় স্বাস্থ্য ও সমতার ক্ষেত্রে এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ব পানি দিবসের এই আয়োজন তাই কেবল সচেতনতা নয়, বরং অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে নারীদের পানির নিশ্চয়তা দেওয়ার এক জোরালো আহ্বান জানায়।
















