গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনি লেখিকা সারা আওয়াদ ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে ঘোষিত “যুদ্ধবিরতি” চলাকালীন তার জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেছেন, গাজায় এখনো প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে ইসরায়েল, এবং এই যুদ্ধবিরতি এক ‘ভয়ঙ্কর প্রহসন’।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার দশ দিন পর তিনি কিছুটা নিরাপত্তার আশায় গাজার মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত আজ-জাওয়াইদা এলাকার পারিবারিক তাঁবু থেকে কাছের টুইক্স ক্যাফেতে গিয়েছিলেন। সেখানে ফ্রিল্যান্সার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কো-ওয়ার্কিং স্পেস ছিল। লেখিকা এবং তার ভাই ক্যাফের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরই একটি পরিচিত বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান – একটি ইসরায়েলি ড্রোন টুইক্স ক্যাফের প্রবেশপথে আঘাত হানে।
এই হামলায় তিনজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। তিনি বলেন, এর চেয়ে কয়েক মিনিট আগে বের হলে তারাও হতাহতের শিকার হতে পারতেন। এই ঘটনার পর তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি প্রশ্ন করেন, “এটা কেমন যুদ্ধবিরতি?” বিদেশী নেতারা যখন ঘোষণা করেছিলেন যে যুদ্ধ শেষ, তখন গাজার অনেকে আশাবাদী হয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন বিস্ফোরণ বন্ধ হবে এবং তারা নির্ভয়ে তাদের বিধ্বস্ত জীবন পুনর্গঠন শুরু করতে পারবেন। কিন্তু ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অধীনে সেই আশা নেই। সেই দিন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী টুইক্স ক্যাফেতে বোমা হামলার পাশাপাশি গাজা উপত্যকার আরও কয়েক ডজন স্থানে বোমা বর্ষণ করে, এতে কমপক্ষে ৪৫ জন নিহত এবং অনেকে আহত হন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সেটিই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক দিন। লেখিকার মতে, একটি দিনও হতাহত ছাড়া কাটেনি; ইসরায়েল প্রতিদিন হত্যা অব্যাহত রেখেছে। তথাকথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন আবু শাবান পরিবারের ১১ জন সদস্য। ১৮ অক্টোবর, ব্যাপক বোমা হামলার ঠিক আগের দিন, আবু শাবান পরিবারের সদস্যরা গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় তাদের বাড়িতে ফিরছিলেন। একটি গাড়িতে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি বোমায় চারজন প্রাপ্তবয়স্ক (সুফিয়ান, সামার, ইহাব ও রান্দা) এবং সাতটি শিশুর (১০ বছরের কারাম, ৮ বছরের আনাস, ১২ বছরের নেসমা, ১৩ বছরের নাসের, ১০ বছরের জুম্মানা, ৬ বছরের ইব্রাহিম ও ৫ বছরের মোহাম্মদ) জীবন কেড়ে নেয়।
রবিবার এই ব্যাপক বোমা হামলা শুরু হলে পুরো উপত্যকায় আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণ চলার সময় মানুষজন বাজারে ভিড় করে, কারণ তারা ভেবেছিল যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ আবার শুরু হতে পারে। বোমা হামলার মধ্যেও মানুষের মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে খাবারের দিকে মনোনিবেশ করছে, যা লেখিকার কাছে হৃদয়বিদারক মনে হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইসরায়েল শুধু বোমা হামলা করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে না, বরং তারা যে ত্রাণ সহায়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, তা থেকেও বিরত থাকছে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০০ ট্রাক ত্রাণ গাজায় প্রবেশের কথা ছিল। গাজা মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় মাত্র ৯৮৬টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করেছে – যা প্রতিশ্রুত পরিমাণের মাত্র ১৫ শতাংশ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) হিসেব করে বলেছে, তাদের মাত্র ৫৩০টি ট্রাক প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। ইউএনআরডব্লিউএ-এর ৬,০০০ ট্রাক অপেক্ষমাণ থাকলেও একটিকেও প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ডব্লিউএফপি-এর মুখপাত্র বলেছেন যে গাজা সিটিতে কোনো বড় ত্রাণ বহর প্রবেশ করতে পারেনি, কারণ ইসরায়েল এখনো সালাহ আল-দীন রাস্তা ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না। গাজার উত্তরাংশকে ক্ষুধার্ত রাখার ইসরায়েলি নীতি এখনও কার্যকর রয়েছে।
বিশ্বের সঙ্গে গাজার একমাত্র যোগসূত্র রাফা সীমান্ত ক্রসিং এখনও বন্ধ রয়েছে। হাজার হাজার আহত মানুষ কবে জরুরি চিকিৎসার জন্য পার হতে পারবে, শিক্ষার্থীরা কখন শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যেতে পারবে, যুদ্ধে বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলো কবে একত্রিত হবে, এবং যারা গাজাকে ভালোবাসেন তারা কবে ঘরে ফিরতে পারবেন – তা কেউ জানে না।
এটা এখন স্পষ্ট যে ইসরায়েল এই “যুদ্ধবিরতিকে” একটি সুইচের মতো ব্যবহার করছে – যখন খুশি চালু করছে এবং যখন খুশি বন্ধ করছে। রবিবার আবার ব্যাপক বোমা হামলা শুরু হয়েছিল, সোমবার আবার “যুদ্ধবিরতি” ফিরে আসে। মনে হচ্ছে যেন কিছুই ঘটেনি, ৪৫ জন মানুষকে হত্যা করা হয়নি, কোনো বাড়ি ধ্বংস হয়নি এবং কোনো পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়নি। তিনি বলেন, তাদের জীবনকে এমনভাবে গণ্য করা হচ্ছে যেন এর কোনো মূল্য নেই।
এই যুদ্ধবিরতিকে তারা এখন এক অন্তহীন যুদ্ধের একটি বিরতি ছাড়া আর কিছু মনে করেন না – যে বিরতি যে কোনো মুহূর্তে শেষ হতে পারে। তিনি মনে করেন, বিশ্ব যতক্ষণ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার অধিকারকে স্বীকৃতি না দেবে এবং তা নিশ্চিত করার জন্য প্রকৃত পদক্ষেপ না নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা এক খুনী দখলদার শক্তির করুণার পাত্র হয়ে থাকবেন।















