জ্বালানি সংকট ও পরিবেশগত চাহিদায় বাড়ছে পারমাণবিক বিদ্যুতের গুরুত্ব
বিশ্বের বহু দেশ আবারও নির্ভরযোগ্য ও স্বল্প-কার্বন জ্বালানি হিসেবে পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে
চেরনোবিল দুর্ঘটনার প্রায় চার দশক পর বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক জ্বালানি আবারও শক্তভাবে ফিরে আসছে। বাড়তি জ্বালানি চাহিদা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কম কার্বন নির্গমনের প্রয়োজনীয়তার কারণে অনেক দেশ এখন এই খাতের দিকে নতুন করে নজর দিচ্ছে।
১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউক্রেনে চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর সম্প্রসারণ থমকে যায়। পরে জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনাও জনসমর্থন কমিয়ে দেয়। তবে এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই প্রবণতা উল্টে যাচ্ছে।
বর্তমানে ৩১টি দেশে ৪০০টির বেশি পারমাণবিক রিয়্যাক্টর চালু রয়েছে এবং প্রায় ৭০টি নতুন রিয়্যাক্টর নির্মাণাধীন। বিশ্বে মোট বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ এবং স্বল্প-কার্বন জ্বালানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসে এই খাত থেকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে এবং নির্মাণ ও পরিচালন ব্যয়ও কমেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তির প্রতি আগ্রহ আবারও বাড়ছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও জ্বালানি নিরাপত্তা উদ্বেগও এর একটি বড় কারণ।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদক দেশ, যেখানে ৯৪টি রিয়্যাক্টর চালু রয়েছে এবং বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ এখান থেকে আসে। দেশটি ২০৫০ সালের মধ্যে তার সক্ষমতা চারগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
চীনে বর্তমানে ৬১টি রিয়্যাক্টর চালু রয়েছে এবং প্রায় ৪০টি নির্মাণাধীন, যা দেশটিকে ভবিষ্যতে শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। রাশিয়াও নিজ দেশে এবং বিদেশে দ্রুত এই খাত সম্প্রসারণ করছে।
ইউরোপীয় কমিশন এখন পারমাণবিক শক্তিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন অতীতে পারমাণবিক শক্তি কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে কৌশলগত ভুল বলে উল্লেখ করেছেন।
ফ্রান্স ইউরোপে এই খাতে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ নতুন রিয়্যাক্টর নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
অন্যদিকে জার্মানি ২০২৩ সালে তাদের শেষ পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে, তবে বেলজিয়াম বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বাড়িয়েছে এবং স্পেন ধীরে ধীরে এই খাত থেকে সরে আসার পরিকল্পনা করছে।
জাপান ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা পর্যালোচনা শেষে ১৫টি রিয়্যাক্টর পুনরায় চালু করেছে এবং আরও চালুর প্রস্তুতি চলছে।
আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকা একমাত্র দেশ যেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। মিশর রাশিয়ার সহায়তায় নতুন কেন্দ্র নির্মাণ করছে এবং আরও কয়েকটি দেশ এই প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ভাবনায় পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবেই পারমাণবিক শক্তির এই পুনরুত্থান দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়তে থাকা চাহিদা মেটাতে স্থিতিশীল ও স্বল্প-কার্বন জ্বালানি ভবিষ্যতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।















