প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে দ্রুত ও সহজ করেছে। খাবার অর্ডার থেকে পথনির্দেশ—সবই হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই তাৎক্ষণিক সুবিধার ভিড়ে অনেকেই অনুভব করছেন, মনোযোগ কমছে, গভীর চিন্তার ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে এবং নিজের সঙ্গে সংযোগও ক্ষীণ হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন এক ধারণা সামনে এসেছে—‘ঘর্ষণ বাড়ানো’, অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু অসুবিধা বা ধীরতা জীবনে ফিরিয়ে আনা।
কেন এই ধারণা?
নিরবচ্ছিন্ন বার্তা, সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে অবিরাম স্ক্রল আমাদের মনোযোগ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে বলে বহু বিশেষজ্ঞের মত। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্দায় গড় মনোযোগের সময় কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কাজের মাঝখানে বারবার মনোযোগ বদলালে সময় বেশি লাগে এবং ভুলও বাড়ে।
কিছু গবেষকের মতে, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা স্মৃতি, স্থানিক সচেতনতা ও সামাজিক বুদ্ধিমত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সব গবেষণা একমত নয়, তবু অনেকে মনে করেন সচেতনভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
‘ঘর্ষণ বাড়ানো’ বলতে কী বোঝায়?
এই পদ্ধতিতে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু কাজ কঠিন বা ধীর পদ্ধতিতে করেন। যেমন—
- পথনির্দেশক যন্ত্রের বদলে রাস্তার চিহ্ন দেখে চলা
- সারাংশ না পড়ে মূল বই পড়া
- বার্তার বদলে সরাসরি ফোনে কথা বলা
- হাত দিয়ে চিঠি লেখা
- বিনোদনের বদলে পড়া বা সৃজনশীল কাজ করা
এতে সময় বেশি লাগে, কিন্তু মনোযোগ ও চিন্তায় গভীরতা বাড়তে পারে।
এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী?
মস্তিষ্ক ‘ব্যবহার না করলে হারাও’ নীতিতে কাজ করে। চ্যালেঞ্জিং কাজ নতুন স্নায়ুকোষ সক্রিয় রাখে। বাদ্যযন্ত্র শেখা, ধাঁধা সমাধান, পড়াশোনা বা হাতের কাজ—এসব মানসিক ক্ষমতা দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে সহায়ক।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব কাজে পরিশ্রম লাগে সেগুলো থেকে পাওয়া সাফল্য মস্তিষ্কে পুরস্কারের অনুভূতি বেশি জাগায়। এটিকে কেউ কেউ ‘প্রচেষ্টার বৈপরীত্য’ বলেন—কঠিন পথে অর্জিত সাফল্য বেশি তৃপ্তিদায়ক মনে হয়।
সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা
সব বিশেষজ্ঞ এই ধারণাকে সমাধান হিসেবে দেখেন না। কেউ কেউ মনে করেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা, প্রযুক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হওয়া। স্বল্প সময়ের বিরতিও উপকারী হতে পারে।
‘ঘর্ষণ বাড়ানো’ হয়তো চূড়ান্ত সমাধান নয়, তবে এটি সচেতনতা বাড়াতে পারে। সহজ পথ সবসময় আনন্দদায়ক নয়; কখনও কখনও কঠিন পথই গভীর তৃপ্তি আনে। ধীরতা, মনোযোগ ও অর্থবহ অভিজ্ঞতার জন্য সামান্য অসুবিধা গ্রহণ করাই হতে পারে নতুন ভারসাম্যের চাবিকাঠি।
















