বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও নড়েচড়ে বসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার ভাবছেন এমন এক পদক্ষেপের কথা, যা লাতিন আমেরিকার ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিতে পারে। তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন–কে জানিয়েছেন, ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরে অবস্থিত বলে ধারণা করা কোকেন উৎপাদন কেন্দ্র ও মাদক পাচার পথগুলোতে হামলার পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন। যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
গত শুক্রবার থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ বহর—“ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড”–কে ক্যারিবীয় সাগর অঞ্চলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে, ট্রাম্প সিআইএ–কে অনুমতি দিয়েছেন ভেনিজুয়েলায় গোপন অভিযান চালানোর জন্য।
তবে হোয়াইট হাউসের ভেতরে এখনো আলোচনার দ্বার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি। যদিও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সঙ্গে সক্রিয় আলোচনা বন্ধ ছিল। উল্লেখযোগ্য যে, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ দপ্তরের (UNODC) হিসাব অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলা কোনো কোকেন উৎপাদনকারী দেশ নয়। তবুও ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরো সরকারকে আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে তুলে ধরছে।
একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, “প্রেসিডেন্টের টেবিলে এখন বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে কিছু সরাসরি ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরে অভিযান চালানোর প্রসঙ্গ জড়িত। তিনি এখনো কূটনৈতিক পথ বাদ দেননি, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত আছে।”
আরেক কর্মকর্তা, যিনি সরাসরি এসব আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, জানান যে, এই পরিকল্পনাগুলো সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে সমন্বিতভাবে চলছে। তবে এখন প্রধান মনোযোগ ভেনিজুয়েলার ভেতরের মাদক পাচার চক্রের ওপর।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প প্রকাশ্যে কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী এবার “ভূমিতে হামলা” চালাতে প্রস্তুত। একইসঙ্গে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী মাদকবাহী জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথ জানিয়েছেন, গত এক মাসে অন্তত ১০টি নৌযানে হামলা হয়েছে এবং ৪৩ জন নিহত হয়েছে।
এই সমস্ত পদক্ষেপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, এই “মাদকবিরোধী অভিযান” আসলে নিকোলাস মাদুরো সরকারকে দুর্বল করার এক নতুন কৌশল। প্রশাসনের কিছু প্রভাবশালী সদস্য খোলাখুলি বলেছেন, মাদকবিরোধী এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত “শাসন পরিবর্তন”–এর দিকেই গড়াতে পারে। তাদের ধারণা, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলে যারা কার্টেল ও মাদক আয়ের সঙ্গে যুক্ত, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেই অভ্যন্তরীণভাবে মাদুরোর পতন ঘটানো সম্ভব হতে পারে।
এদিকে, এক সাম্প্রতিক ভিডিওতে মাদুরো নিজেই ইংরেজিতে শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে বাস্তব তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, কোকা ফসল—যা কোকেন তৈরির মূল উপাদান—মূলত কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়াতেই চাষ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (DEA) মার্চ মাসের প্রতিবেদনে ভেনিজুয়েলার নাম উল্লেখই করা হয়নি। সেখানে কোকেন পাচারের প্রধান পথ হিসেবে বলা হয়েছে ইকুয়েডর, মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকোর কথা।
তবুও, ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি—ভেনিজুয়েলা মাদক পাচারের জন্য ব্যবহৃত একটি ট্রানজিট পয়েন্ট, আর প্রেসিডেন্ট মাদুরো নিজেই ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে “নারকো–টেররিজম” ও “কোকেন আমদানি ষড়যন্ত্র”–এর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন।
সেপ্টেম্বরে ইকুয়েডর সফরে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “নিকোলাস মাদুরো একজন অভিযুক্ত মাদক পাচারকারী এবং তিনি মার্কিন ন্যায়বিচারের কাছে একজন পলাতক অপরাধী।”
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ নয়। মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ভেনিজুয়েলার ভেতরে সামরিক অভিযান চালাতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন বা অন্তত ব্রিফিং প্রয়োজন। যদিও ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সিএনএনকে বলেন, বিদেশে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর জন্য কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণা প্রয়োজন নেই।
ট্রাম্পের ভাষায়, “আমি যুদ্ধ ঘোষণার জন্য কংগ্রেসের কাছে যাব না। আমরা শুধু তাদের মেরে ফেলব যারা মাদক আমাদের দেশে ঢোকাচ্ছে। আমরা তাদের খুঁজে বের করব, আর তারা থাকবে মৃত।”
এমন বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এবং বাইরেও নানান প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এটা কি সত্যিই মাদকবিরোধী অভিযান, নাকি নতুন ভূরাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল?
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, “এই সামরিক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্র ধ্বংস করা এবং নারকো–টেররিজম প্রতিহত করা।”
বর্তমানে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ও তার সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলো ক্রোয়েশিয়ার স্প্লিট বন্দরের কাছে অবস্থান করছে। সেখান থেকে ক্যারিবীয় সাগর পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় পাঁচ হাজার মাইল—অর্থাৎ অভিযান শুরু করতে গেলে কয়েকদিন সময় লাগবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইতিমধ্যেই দক্ষিণ কমান্ডে (US Southern Command) বিপুল শক্তি মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে “ইও উ জিমা” অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ, ২২তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটসহ প্রায় ৪৫০০ সৈনিক ও নাবিক। আরও রয়েছে তিনটি গাইডেড–মিসাইল ধ্বংসকারী জাহাজ, একটি সাবমেরিন, একটি স্পেশাল অপারেশন জাহাজ, একটি গাইডেড–মিসাইল ক্রুজার এবং পি–৮ পসেইডন গোয়েন্দা বিমান।
একই সময়ে, পুয়ের্তো রিকোতে মোতায়েন করা হয়েছে ১০টি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান। দ্বীপটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী অভিযানের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। রেইটার্সের ছবিতে দেখা গেছে, সেখানে অন্তত তিনটি এমকিউ–৯ রিপার ড্রোনও স্থাপন করা হয়েছে।
দীর্ঘ ২০ বছর বন্ধ থাকার পর পুয়ের্তো রিকোর নৌঘাঁটি রুজভেল্ট রোডসও আবার সচল হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ঘাঁটিতে ফের সক্রিয়ভাবে সৈন্য চলাচল শুরু হয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে, আমেরিকার এই নতুন পদক্ষেপ যেন এক নীরব ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। একদিকে ট্রাম্পের দৃঢ় কণ্ঠ, “আমরা মাদকবিরোধী যুদ্ধ জিতব,” আর অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে উদ্বেগের মেঘ।
সময়ই বলে দেবে—এটি সত্যিকারের মাদকবিরোধী অভিযান নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন নাট্যমঞ্চ।
















