জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর গেলজেনকির্শেনে বড়দিনের ঠিক পরের এক নিরিবিলি সপ্তাহান্তে সংঘটিত হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম চাঞ্চল্যকর ব্যাংক ডাকাতি। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত শক্তিশালী ড্রিল দিয়ে দেয়ালে গর্ত করে একদল চোর একটি সঞ্চয়ী ব্যাংকের ভল্টে ঢুকে পড়ে এবং তিন হাজারের বেশি সেফ ডিপোজিট বাক্স ভেঙে কোটি কোটি ইউরো নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর রাইন-ভেস্টফালিয়া অঙ্গরাজ্যের বুয়ার এলাকায় অবস্থিত একটি সঞ্চয়ী ব্যাংকে। তদন্তকারীদের ধারণা, পাশের বহুতল গাড়ি পার্কিং ভবন দিয়ে চোরেরা ব্যাংকে প্রবেশ করে। পার্কিং ভবন ও ব্যাংকের মাঝের একটি জরুরি দরজার ব্যবস্থা তারা নষ্ট করে দেয়, যাতে বাইরে থেকে সহজে ঢোকা যায়। এরপর তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থার একাধিক স্তর অতিক্রম করে বেজমেন্টে থাকা ভল্টের পাশের একটি আর্কাইভ কক্ষে পৌঁছে দেয়ালে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার চওড়া গর্ত করে ভেতরে ঢোকে।
তদন্ত অনুযায়ী, ২৭ থেকে ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে কোনো এক সময় এই ডাকাতি সংঘটিত হয়। ২৭ ডিসেম্বর ভোরে ব্যাংক থেকে অগ্নি সতর্ক সংকেত পেয়ে দমকল ও একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা সেখানে পৌঁছায়। তবে ভেতরে ধোঁয়া বা আগুনের কোনো চিহ্ন না পাওয়ায় ঘটনাটি মিথ্যা সংকেত বলে ধরে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, সতর্ক সংকেতটি ভল্ট এলাকা থেকেই এসেছিল। কিন্তু সে সময় পুলিশ তল্লাশির অনুমতি পায়নি।
ভল্টে ঢুকে চোরেরা প্রায় ৩ হাজার ২৫০টি সেফ ডিপোজিট বাক্সের অধিকাংশই ভেঙে ফেলে। ব্যাংকের কম্পিউটার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বাক্স খোলা হয় সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে এবং শেষটি দুপুর ২টা ৪৪ মিনিটে। তবে চার ঘণ্টায় এত বিপুল সংখ্যক বাক্স ভাঙা সম্ভব হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২৯ ডিসেম্বর ভোরে আরেকটি অগ্নি সংকেত পাওয়ার পর দমকল বাহিনী ফিরে এসে ভল্টে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখতে পায়। মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে ছিল অর্ধলক্ষাধিক নথি ও বিভিন্ন সামগ্রী। অনেক জিনিসপত্রে পানি ও রাসায়নিক ঢেলে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছে, যেখানে মুখোশ পরা কয়েকজন ব্যক্তিকে বড় ব্যাগ বহন করতে দেখা যায়। দুটি গাড়ির ছবি পাওয়া গেছে, যেগুলোতে ভুয়া নম্বরপ্লেট ছিল।
কত অর্থ ও সম্পদ লুট হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। জার্মান গণমাধ্যমের অনুমান, প্রায় ১০০ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। ব্যাংকের দাবি, প্রতিটি সেফ ডিপোজিট বাক্স সাধারণত ১০ হাজার ৩০০ ইউরো পর্যন্ত বিমাকৃত ছিল।
ঘটনার পর প্রায় ২০০ গ্রাহক ব্যাংকের সামনে জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেকে দাবি করেছেন, তাদের আজীবনের সঞ্চয় ও পারিবারিক গয়না হারিয়ে গেছে। এক গ্রাহক জানান, তার কয়েক হাজার ইউরো মূল্যের সোনা ও পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গয়না চুরি হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিরাপত্তায় গাফিলতির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন।
অঙ্গরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হারবার্ট রয়েল প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় ড্রিলের শব্দ কেউ শুনল না কেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ভেতরের সহযোগিতা ছিল কি না। পুলিশ প্রধান টিম ফ্রমায়ার বলেছেন, এটি অঙ্গরাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম বড় অপরাধমূলক ঘটনা। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। একটি ডানপন্থী দল ব্যাংকের সামনে সমাবেশ করে বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকের মতে, এই ডাকাতি শুধু আর্থিক ক্ষতির ঘটনা নয়, বরং নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে মানুষের আস্থার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
















