লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ি শহর জিনতানে নিজ বাসভবনের ভেতরে গুলিতে নিহত হন সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি। নিরাপত্তা ক্যামেরা অকার্যকর করার পর মুখোশধারী হামলাকারীরা ভেতরে ঢোকে। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তার নিরাপত্তারক্ষীরা রহস্যজনকভাবে সরে যায়। গুলি চালানোর পর হামলাকারীরা পালায়নি, ধাওয়া হয়নি, দায় স্বীকারও করেনি কেউ। লিবিয়ার প্রেক্ষাপটে এমন নীরবতা সাধারণত ইঙ্গিত দেয়—হত্যাকারীদের তদন্তের ভয় নেই।
সাইফ ছিলেন দীর্ঘ চার দশক লিবিয়া শাসনকারী মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে। ২০১১ সালের বিপ্লবের পর দেশটি কার্যত দুই ক্ষমতাকেন্দ্রে বিভক্ত। পশ্চিমে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার, আর পূর্বে খলিফা হাফতারের নিয়ন্ত্রিত সামরিক শক্তি। কোন পক্ষই জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করেনি, কিংবা সে পথে এগোচ্ছে না।
হত্যাকাণ্ডের ধরন অনেক প্রশ্ন তোলে। এটি আকস্মিক বিশৃঙ্খলার ফল নয়, বরং সুপরিকল্পিত অভিযান—যারা সাইফের চলাফেরা, নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা জানত, তারাই এমনটি করতে পারত। বহু বছর তিনি আড়ালে ছিলেন, কখনো স্থানীয় সমঝোতা, কখনো বিদেশঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহায়তায় সুরক্ষিত। কিন্তু হামলার রাতে সেই সুরক্ষা হঠাৎ উধাও।
লিবিয়ায় সরাসরি প্রমাণ খুব কমই সামনে আসে; বরং ধরা পড়ে ধারাবাহিকতার ছাপ। অতীতে পূর্বাঞ্চলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নীরবে সরিয়ে দেওয়ার নজির রয়েছে। প্রকাশ্য সংঘর্ষের বদলে লক্ষ্যভিত্তিক অপসারণ—যেখানে তদন্ত অগ্রসর হয় না। এই ধরনের কার্যক্রমে পুরো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ লাগে না; লাগে নেটওয়ার্ক, ভয় প্রদর্শন এবং দায়মুক্তির নিশ্চয়তা।
সাইফ পরিবর্তনের প্রতীক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিকল্প উত্তরাধিকারের প্রতীক। হাফতারের জোট আদর্শ নয়, পৃষ্ঠপোষকতার ভারসাম্যে টিকে আছে। বিভিন্ন গোত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর আনুগত্য লেনদেননির্ভর। হাফতারের অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস অনিবার্য হতো। সেই মুহূর্তে গাদ্দাফি নামের ঐতিহাসিক ও প্রতীকী শক্তি একত্রিত করার মতো একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন সাইফ। তিনি হয়তো একই কাঠামোই ব্যবহার করতেন, কিন্তু অন্য পরিবারের নেতৃত্বে। এটাই তাকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল।
হত্যার দুই দিন আগে প্যারিসে গোপন বৈঠকের খবরও সামনে আসে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরগুলোর মধ্যে নতুন অন্তর্বর্তী সমঝোতার আলোচনা হয়েছিল বলে গুঞ্জন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লিবিয়ায় নির্বাচন হয়নি। বারবার অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে। এমন প্রেক্ষাপটে যদি পারিবারিক সমঝোতায় ক্ষমতা বণ্টনের পথ তৈরি হতো, জনঅসন্তোষ বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারত। সাইফ কেবল ব্যালটে উপস্থিত থাকলেই সেই ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারতেন। ২০২১ সালের ভেস্তে যাওয়া নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে তিনি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছিলেন।
মৃত্যুর পরও নিয়ন্ত্রণ থামেনি। তার গোত্র তাকে বাবার শহর সিরতে দাফন করতে চাইলেও অনুমতি মেলেনি; বানী ওয়ালিদে সমাহিত করা হয়। শোকসভা সীমিত করা হয়। জীবদ্দশায় কোথায় থাকবেন, কাদের সঙ্গে দেখা করবেন—তা অন্যরা ঠিক করেছে; মৃত্যুর পর কোথায় কবর হবে, তাও নির্ধারিত হয়েছে ক্ষমতাকেন্দ্রের সিদ্ধান্তে।
কেউ গ্রেপ্তার হয়নি, হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। লিবিয়ায় কোনো হত্যাকাণ্ডের পর যদি দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে, সেটি সাধারণত প্রশ্নের অভাব নয়—বরং উত্তরই।
















