তেহরান – দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভের পর ইরানের কর্তৃপক্ষ রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় বহু ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ কূটনৈতিক পরিস্থিতি ও তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য চাপে পড়েছে।
বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই ছিল তেহরানের কেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, কফি রোস্টারি, আর্ট গ্যালারি ও আইসক্রিমের দোকান—যেখানে তরুণদের সমাগম বেশি ছিল। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ধর্মঘট পালন করেছিল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থন জানিয়েছিল বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কারণ জানায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পাতায় দেওয়া নোটিশে বলা হয়েছে, তাদের কনটেন্ট “দেশের নিয়ম লঙ্ঘন” করেছে এবং “পুলিশি বিধি মানেনি”।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফার্স এক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী সাঈদিনিয়ার স্বীকারোক্তিপত্র প্রকাশ করেছে বলে দাবি করেছে। ৮১ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী ও তাঁর পরিবার দেশজুড়ে একাধিক জনপ্রিয় ক্যাফে ও খাদ্য ব্র্যান্ড পরিচালনা করতেন। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, বিক্ষোভের পর তাঁকে আটক করা হয়েছে, তাঁর ব্যবসা বন্ধ ও সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
সরকারি হিসাবে বিক্ষোভে ৩,১১৭ জন নিহত হয়েছেন। সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থনপুষ্ট “দাঙ্গাবাজ ও সন্ত্রাসীদের” দায়ী করেছে। তবে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করেছে, এমনকি শিশুদের বিরুদ্ধেও। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার কর্মীদের একটি সংস্থা নিহতের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার বলে দাবি করেছে, আর জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনকারী মাই সাতো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রকৃত তথ্য পাওয়া কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন।
অর্থনীতিতে চাপ
বিক্ষোভের এক মাস পরও অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়নি। ইরানি মুদ্রা রিয়াল ডলারের বিপরীতে ঐতিহাসিক নিম্নমুখী অবস্থানের কাছাকাছি লেনদেন হচ্ছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দোকানপাট খোলা থাকলেও বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কম। এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, এখন নগদ লেনদেন বাড়ছে, চেক ব্যবহারে অনীহা তৈরি হয়েছে।
ডাউনটাউনের জোমহুরি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এখনো চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিপ্লববার্ষিকী ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন
দেশটি ১৯৭৯ সালের বিপ্লববার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি জনগণকে রাষ্ট্রীয় সমাবেশে অংশ নিয়ে “শত্রুকে হতাশ” করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও একই আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের মধ্যে হুমকি-পাল্টা হুমকি অব্যাহত রয়েছে। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি মাসকাটে ওমানি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন ইরান ইস্যুতে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থনৈতিক সংকট মিলিয়ে ইরান এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
















