শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের ছাত্র–যুব অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসকের পতন ঘটলেও, নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা তরুণ প্রজন্ম এখন দেখছে নির্বাচনী লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন পুরোনো প্রজন্মের নেতারাই।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের দখলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন এবং শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে করে দেশত্যাগের দৃশ্য বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। এই আন্দোলন শুধু বাংলাদেশেই নয়, নেপাল ও মাদাগাস্কারসহ বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে।
হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামল জুড়ে নির্বাচন কারচুপি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট ও বিরোধী কণ্ঠ দমনের অভিযোগ ছিল। সেই অধ্যায়ের অবসানে অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করলেও, নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা তরুণ আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করছেন না।
একদিকে রয়েছেন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান, যিনি একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। অন্যদিকে ৬৭ বছর বয়সী জামায়াতে ইসলামী নেতা, যার দল এবারের নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। ফলে সমতা ও অন্তর্ভুক্তির যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণরা আন্দোলনে নেমেছিল, তার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের মাধ্যমে। সরকারের কঠোর দমন–পীড়ন পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেনাবাহিনী গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানালে হাসিনার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে আদালত তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন অনুপস্থিত অবস্থায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসেবে, সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন, আর বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ দাবি করছে। তার দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যগত প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফিরে তারেক রহমান এখন প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীও নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করেছে, যা হাসিনার আমলে কঠোর নজরদারির মধ্যে ছিল।
ছাত্রদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি শুরুতে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা শক্ত অবস্থান নিতে হিমশিম খাচ্ছে। সম্প্রতি জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন তাদের সমর্থকদের একাংশকে বিস্মিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশে নিরাপত্তা পাওয়ার লক্ষ্যেই এই জোট।
এদিকে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্রার্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবু অনেকেই এই নির্বাচনকে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক ভোট হিসেবে দেখছেন। ঢাকার রাস্তায় এখনো উত্তেজনা ও প্রত্যাশার আবহ বিরাজ করছে।
এক সময়ের ছাত্র আন্দোলনকারী মির্জা শাকিলের ভাষায়, নির্বাচন নতুন কিছু বয়ে আনতে পারে। তরুণদের আশা এখনো পুরোপুরি নিভে যায়নি, তবে তাদের বিপ্লবের পরিণতি কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণ করবে ব্যালট বাক্সের ফলাফল।
















