শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। জুলাই সনদ নামে পরিচিত সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোট এবং সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিক নির্ধারণ করতে পারে।
২০২৪ সালের বর্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের অধীন করে রাখার অভিযোগ ছিল তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই ভেঙে পড়া প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে এবং শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম করছে।
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করছে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর—তারা কতটা শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য ভোট আয়োজন করতে পারে তার ওপর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা, ভুয়া তথ্যের বিস্তার এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের বড় অংশই তরুণ। দেশের মধ্যম বয়স প্রায় ২৬ বছর। ফলে বিপুলসংখ্যক ভোটার এমন এক সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছেন, যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব ছিল সীমিত—কারণ আগের সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ ছিল প্রবল। তাই এবারের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন ও তুলনামূলক অনভিজ্ঞ ভোটারদের সংগঠিত করার সক্ষমতার ওপর।
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের দমন–পীড়নের ঘটনায় প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে নির্বাচনের বাইরে রয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই কারাগারে বা নির্বাসনে থাকায় সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। তবু দেশের কিছু অঞ্চলে দলটির সমর্থন রয়ে গেছে। বিশেষ করে ফরিদপুরসহ মধ্যাঞ্চলের ঐতিহ্যগত ঘাঁটিতে এই ভোটব্যাংক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে বিএনপি। তবে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী নতুন বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করছে। তারা তরুণনির্ভর জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে বিএনপির চ্যালেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে। এই সমীকরণে জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রায় ৩০টি আসনে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা দেখছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির পূর্বসূরি ছাত্রদের আন্দোলন শেখ হাসিনা বিরোধী অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর তারা সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নির্বাচনে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় দলটি জোট রাজনীতির পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
জামায়াতের জন্য এই নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তারা বিএনপির বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে তারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। পাল্টা হিসেবে বিএনপি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকাকে সামনে আনছে।
যদিও বিএনপি এখনো এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবু তাদের শাসনক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অতীতের দুর্বল প্রশাসন ও দুর্নীতির অভিযোগ এই সংশয় বাড়িয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, জামায়াত দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে।
জামায়াতের ছাত্রসংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে বড় সাফল্য পেয়েছে, যা তাদের পক্ষে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। প্রযুক্তিসচেতন তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই জোটের ভেতরে মতপার্থক্যও রয়েছে; অনেক প্রগতিশীল নেতা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন।
একটি বিষয় স্পষ্ট—ইসলামপন্থী দলগুলো আর কেবল ক্ষমতার দালাল নয়, বরং স্বাধীন রাজনৈতিক মেরু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। দীর্ঘদিন ডানপন্থী রাজনীতিতে প্রভাবশালী বিএনপি এখন আরও ডানপন্থী চ্যালেঞ্জের মুখে।
সম্ভাব্য সমর্থনক্ষয় ঠেকাতে বিএনপি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক সমাজ ও সুফি ধারার মুসলমানদের কাছে টানার চেষ্টা করছে—যারা আগে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই পুনর্বিন্যাস প্রমাণ করছে, বাংলাদেশের রাজনীতি কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রতিফলন ব্যালট বাক্সে স্পষ্ট হতে পারে।
















