মানুষের শরীরের গন্ধের ভেতর লুকিয়ে থাকে বিস্ময়কর পরিমাণ মানসিক ও জৈবিক তথ্য। তবু আমরা সচেতনভাবে এই সংকেতগুলো প্রায় উপেক্ষা করি। অথচ গন্ধ আমাদের স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, এমনকি জিনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও ইঙ্গিত দিতে পারে।
ইতিহাস বলছে, গন্ধের গুরুত্ব মানুষ বহু আগেই বুঝেছিল। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই সুগন্ধিতে ছিলেন আচ্ছন্ন। ভার্সাই প্রাসাদের ঘর, আসবাব, এমনকি অতিথিদের শরীরেও সুগন্ধি ছিটানো হতো। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব হোক বা গন্ধের প্রতি ভালোবাসা—তিনি জানতেন, গন্ধ মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
শরীরের গন্ধ থেকে রোগের আভাসও পাওয়া যায়। কলেরা রোগীর গন্ধ মিষ্টি, ডায়াবেটিসে পচা আপেলের মতো গন্ধ পাওয়া যেতে পারে। খাদ্যাভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি মাংস খাওয়া মানুষের শরীরের গন্ধ অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।
নারীদের শরীরের গন্ধ মাসিক চক্রের নির্দিষ্ট সময়ে পুরুষদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় লাগে, বিশেষ করে যখন নারী সবচেয়ে বেশি উর্বর থাকে। ধারণা করা হয়, আদিম যুগে এটি প্রজননের জন্য উপযুক্ত সঙ্গী শনাক্তে সহায়ক ছিল। পুরুষদের ক্ষেত্রেও হরমোন, বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন, শরীরের গন্ধে প্রভাব ফেলে।
তবে শরীরের গন্ধের বড় অংশই নির্ধারিত হয় জিনের মাধ্যমে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ঘ্রাণশক্তি এতটাই সূক্ষ্ম যে একই রকম জিনের যমজদের ঘামের জামা অন্যদের থেকে আলাদা করে চেনা সম্ভব। এমনকি একই ব্যক্তির দুটি জামাকেও যমজের মতো ভুল করা হয়েছে পরীক্ষায়।
এই কারণেই বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গন্ধের মাধ্যমে আমরা অবচেতনভাবে অন্যের জিনগত তথ্য শনাক্ত করতে পারি। আমরা যে সুগন্ধি পছন্দ করি, সেটিও অনেক সময় আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক গন্ধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কেউ কোন সুগন্ধি ব্যবহার করছে, তা দেখে তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব।
একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় নারীদের কিছু পুরুষের পরা জামার গন্ধ মূল্যায়ন করতে বলা হয়। নারীরা যাদের গন্ধ বেশি পছন্দ করেছেন, তাদের সঙ্গে নারীদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জিনগত পার্থক্যও ছিল বেশি। এই জিনগত পার্থক্য ভবিষ্যৎ সন্তানের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে বাস্তবে মানুষ সঙ্গী নির্বাচনের সময় গন্ধকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। হাজার হাজার বিবাহিত দম্পতির ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, দম্পতিদের মধ্যে এই জিনগত পার্থক্য কাকতালীয়, ইচ্ছাকৃত নয়। অর্থাৎ আমরা গন্ধ পছন্দ করতে পারি, কিন্তু বিয়ের সিদ্ধান্তে সেটি নির্ধারক হয় না।
তবু গন্ধ সম্পর্কের গুণগত মানে প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব দম্পতির জিনগত পার্থক্য বেশি, তাদের মধ্যে যৌন সন্তুষ্টি ও সন্তান নেওয়ার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব বেশি স্পষ্ট।
একাকী বা অবিবাহিত পুরুষদের শরীরের গন্ধ অনেক সময় বেশি তীব্র হয়। গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে টেস্টোস্টেরনের ভূমিকা আছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং পরিবারকেন্দ্রিক জীবনে প্রবেশ করলে এই হরমোন কমে যায়, ফলে গন্ধও তুলনামূলকভাবে হালকা হয়।
সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, শরীরের গন্ধ আমাদের প্রজনন সক্ষমতা ও জিনগত মানের সংকেত বহন করে এবং আমরা তা শনাক্তও করতে পারি। কিন্তু আধুনিক সমাজে আমরা সুগন্ধি ও পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে প্রকৃত গন্ধ ঢেকে ফেলেছি। তাই বাস্তব জীবনে সঙ্গী নির্বাচনে গন্ধের ভূমিকা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
একজন গবেষকের ভাষায়, শুধু ভালো জিন খোঁজাই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে গন্ধের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের কাছে সম্পর্ক মানে শুধু জিন নয়—ভালোবাসা, মূল্যবোধ ও বাস্তবতার সমন্বয়। তাই গন্ধ থেকে পাওয়া ইঙ্গিত থাকলেও, সিদ্ধান্তে সেটি খুব কমই প্রাধান্য পায়।
















