ইতালিজুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন কিছু রহস্যময় ভ্রাতৃসংঘ, যাদের সদস্যরা শত শত বছরের পুরোনো খাবারের রেসিপি ও ঐতিহ্য রক্ষার শপথ নিয়েছেন। মধ্যযুগীয় আচার, মখমলের পোশাক, পদক আর আনুষ্ঠানিক ভাষার আড়ালে তাদের একটাই লক্ষ্য—নিজ নিজ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারকে সময়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা।
ভেরোনায় এক রিসোটো উৎসবে লবণাক্ত কড মাছের ঝোল সংরক্ষণকারী এক ভ্রাতৃসংঘের সহসভাপতির সঙ্গে পরিচয়ের সময় লেখকের মনে হয়েছিল, হয়তো এসব সংঘ গোপন মোমবাতির আলোয় চেখে দেখা আর রহস্যময় দীক্ষানুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে সেই মানুষটি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাখ্যা করছিলেন, কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বায়ন ও আধুনিক জীবনধারা তাদের প্রাচীন রেসিপিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এরপর হঠাৎই তিনি সোনালি মখমলের পোশাক পরে, গলায় পদক ঝুলিয়ে মঞ্চে উঠে পড়েন। আবেগ আর আড়ম্বরের সঙ্গে তুলে ধরেন ভিচেন্জার ঐতিহ্যবাহী বাকার্লা খাবারের ইতিহাস ও মাহাত্ম্য।
এই ভ্রাতৃসংঘের সদস্য মারিও কালগারো পেশায় আইনজীবী। ২০১২ সালে তিনি ভিচেন্জার বিখ্যাত বাকার্লা রেসিপি রক্ষাকারী সংঘে যোগ দেন। এই সংঘটি গঠিত হয় ১৯৮৭ সালে, যার লক্ষ্য ১৫ শতক থেকে চলে আসা একটি নির্দিষ্ট রান্নার পদ্ধতিকে সংরক্ষণ করা।
এ ধরনের সংগঠন ইতালিতে হাতে গোনা নয়। শতাধিক ভ্রাতৃসংঘ রয়েছে, যারা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ ইতালির গ্রাম পর্যন্ত নানা স্থানীয় খাবার পাহারা দেয়। কোথাও বিশেষ ধরনের রাভিওলি, কোথাও শুকনো মরিচ, আবার কোথাও শতাব্দীপ্রাচীন শুকনো মাংস।
এই সংঘগুলো নিজেদের দায়িত্বকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। তাদের রয়েছে গ্র্যান্ড মাস্টার, ডোজ বা প্রধান, সদস্যদের আনুগত্যের শপথ, এমনকি দীক্ষানুষ্ঠানে তলোয়ার দিয়ে আনুষ্ঠানিক ‘নাইট’ বানানোর রীতিও। অনেক ক্ষেত্রেই এসব আচার দেখে মনে হয়, যেন কোনো মধ্যযুগীয় গল্পের অংশ।
লবণাক্ত কড মাছের ইতিহাসও নাটকীয়। ১৪৩১ সালে এক ভেনিসীয় ব্যবসায়ীর জাহাজডুবির পর নরওয়ের এক দ্বীপে আশ্রয় পাওয়া থেকে এই মাছ ইতালিতে আসে। ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে দরিদ্র মানুষের পুষ্টিকর ও সংরক্ষণযোগ্য খাবার। সেই ইতিহাস আজও ধরে রাখতে চায় ভ্রাতৃসংঘগুলো।
কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কম নয়। বাকার্লা রান্না করতে লাগে চার দিন—তিন দিন শুধু মাছ ভিজিয়ে রাখা, এরপর ছয় ঘণ্টা ধীরে ধীরে রান্না। আধুনিক জীবনে এত সময় দেওয়া কঠিন। তাছাড়া আর্কটিক অঞ্চলে কড মাছের মজুতও কমে যাচ্ছে।
একই অবস্থা বিভিন্ন শুকনো মাংসের ক্ষেত্রেও। কিছু ভ্রাতৃসংঘ শূকরের বিশেষ অংশ দিয়ে তৈরি সসেজ বা সালামির ঐতিহ্য রক্ষা করছে। তাদের সবচেয়ে বড় আয়োজন হলো বছরে একবার সেরা মানের খাবার বেছে নেওয়ার প্রতিযোগিতা, যেখানে স্বাদ, গন্ধ, রং, স্পর্শ—সবকিছুই কঠোরভাবে বিচার করা হয়।
তবে এসব সংঘ শুধু অতীত আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় না। কিছু সংগঠন তরুণ প্রজন্ম ও বিদেশিদের যুক্ত করতে চাইছে, সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে খাবারকে ইতিহাস, সংগীত ও শিল্পের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করতে চায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই গুরুগম্ভীর দায়িত্ব পালন করলেও তারা আনন্দকে ভুলে যায় না। নতুন সদস্যকে আসল সংরক্ষিত মাছ দিয়ে দীক্ষা দেওয়া, কিংবা খাবারের নামের মধ্যেই হালকা রসিকতা—সব মিলিয়ে এসব ভ্রাতৃসংঘ আসলে খাবারপ্রেমী মানুষের সামাজিক আড্ডার জায়গাও।
একজন সদস্যের ভাষায়, এই ভ্রাতৃসংঘগুলো আসলে উৎসব করারই এক চমৎকার অজুহাত—যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর খাবারের প্রতি ভালোবাসা একসঙ্গে উদযাপিত হয়।
















