ওয়াশিংটন থেকে
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলোতেও যিনি তার পাশে থেকেছেন, সেই স্টিফেন মিলার এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর একটি নাম। বহু বছর ধরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক কট্টর রক্ষণশীল কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত মিলার এখন হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারণে এমন এক প্রভাবশালী চরিত্রে পরিণত হয়েছেন, যাকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে নীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক উপপ্রধান হিসেবে মিলারের আগ্রাসী ও সংঘাতমুখী ভূমিকা ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতিকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা বিস্তারের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরুতে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চগতির কার্যক্রম মিলারকে প্রশাসনের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থীদের কাছে মিলার একজন ‘খলনায়ক’। ওয়াশিংটন ডিসির বিভিন্ন জায়গায় তার মুখের ছবি সম্বলিত পোস্টারে লেখা হয়েছে, ‘ফ্যাসিবাদ সুন্দর নয়’। ডেমোক্র্যাটরা তার পদত্যাগ দাবি করছেন। এমনকি রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেও কেউ কেউ তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সম্প্রতি মিলার এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছেন, যা তার জন্য নতুন। দীর্ঘদিন আড়ালে থেকে কাজ করা এই নীতিনির্ধারক এখন সরাসরি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে, যেখানে তার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে তাকে আগের মতো আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকেও সাময়িকভাবে সরে আসতে হয়েছে।
মিনিয়াপলিসে গত মাসে দুই ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হওয়ার পর মিলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ ও ‘ঘাতক’ বলে আখ্যা দেন। পরে ভিডিও প্রমাণে দেখা যায়, প্রেটি অস্ত্রধারী হলেও কর্মকর্তাদের হুমকি দেননি। এর পর মিলার এক বিবৃতিতে বলেন, প্রাথমিক তথ্য মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হয়তো সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেননি। এটি তার জন্য বিরল এক পিছু হটা হিসেবে দেখা হয়।
ডেমোক্র্যাট সমালোচকরা বলেন, এই ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। তাদের অভিযোগ, মিলারের বক্তব্য অভিবাসন সংস্থাগুলোকে বিক্ষোভে সহিংস প্রতিক্রিয়ায় উৎসাহিত করছে। মে মাসে মিলার প্রকাশ্যে অভিবাসন কর্মকর্তাদের আরও বেশি আটক ও বহিষ্কারের নির্দেশ দেন এবং দিনে তিন হাজার গ্রেপ্তারের লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
এই কঠোর নীতির প্রভাব জনমতেও পড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে ৩৯ শতাংশে। অধিকাংশ মানুষ মনে করছেন, অভিবাসন সংস্থাগুলোর কৌশল অতিরিক্ত কঠোর হয়ে গেছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে এই পরিস্থিতি মিলারকে আরও বেশি সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে।
তবু মিলারকে সহজে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, মানসিকও। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা বলেন, ‘সবসময় শক্ত থাকো, কখনো পিছু হটো না’—এই দর্শনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বাহক মিলার। অভিবাসন থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত নানা ইস্যুতে তিনি প্রায়ই প্রেসিডেন্টের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেন।
মিলারের ক্ষমতার বিস্তার কেবল অভ্যন্তরীণ নীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইয়েমেন, ক্যারিবিয়ান কিংবা ভেনেজুয়েলা ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তেও তার ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে পুরো পশ্চিম গোলার্ধের প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবেই তাকে দেখা হচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রকে এক বিপজ্জনক পথে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শক্তি ও বলপ্রয়োগই নীতির মূল ভিত্তি। অন্যদিকে সমর্থকরা বলেন, বদলে যাওয়া বিশ্ব বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় এমন অবস্থান প্রয়োজন।
সব বিতর্কের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট—ডোনাল্ড ট্রাম্প যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, ততদিন স্টিফেন মিলার তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী সহযোগীদের একজন হিসেবেই থাকবেন। অনেকের মতে, ট্রাম্প যুগের শেষ প্রহরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যাদের একসঙ্গে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যাবে, মিলার তাদেরই একজন।
















