জাপানের আকস্মিক সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দল ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সংসদের শক্তিশালী নিম্নকক্ষে সুপারমেজরিটি নিশ্চিত করেছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ৪৬৫ আসনের নিম্নকক্ষে তাকাইচির দল ৩১৬টি আসনে জয় পেয়েছে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৩৩ আসনের অনেক বেশি।
নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাকাইচি বলেন, তার দল দায়িত্বশীল ও সক্রিয় আর্থিক নীতির গুরুত্ব বারবার তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, আর্থিক নীতির টেকসই কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
গত কয়েক দশক ধরে জাপানের রাজনীতিতে প্রভাবশালী লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অর্থায়ন ও ধর্মীয় কেলেঙ্কারির কারণে চাপের মুখে ছিল। মাত্র তিন মাস আগে ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করতেই তাকাইচি এই আকস্মিক নির্বাচনের ডাক দেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে খাদ্যপণ্যের ওপর আট শতাংশ বিক্রয় কর স্থগিত করার ঘোষণা দেন তাকাইচি। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত জাপান এই কর ছাড়ের অর্থায়ন কীভাবে করবে।
প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাতের কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং কিছু ভোটকেন্দ্র আগেভাগেই বন্ধ করে দিতে হয়।
কিছু ভোটার তাকাইচির নেতৃত্বে দিকনির্দেশনার অনুভূতি পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। আবার অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কর ছাড়ের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আরও বড় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফলের মাধ্যমে তাকাইচি কার্যত বিরোধীদের বাধা উপেক্ষা করে আইন প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছেন। বাজেট অনুমোদন কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তার দলের জন্য আর তেমন রাজনৈতিক বাধা থাকবে না।
তারা মনে করছেন, এই শক্তিশালী জনসমর্থন জাপানের শান্তিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ভাবমূর্তি বদলের পথও প্রশস্ত করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রণীত সংবিধানে জাপানের সামরিক ক্ষমতা সীমিত রাখা হয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলও নির্বাচনের ফলকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য জাপান এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নির্বাচনের ফল চীনও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ক্ষমতায় আসার পরপরই তাকাইচি তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে বেইজিংয়ের সঙ্গে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলেন। শক্তিশালী জনম্যান্ডেট পেলে তার প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনা আরও গতি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল চীনের জন্য স্বস্তির নয় এবং এতে স্পষ্ট হয়েছে যে তাকাইচিকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করার প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
নির্বাচনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকাইচির প্রতি সমর্থন জানান এবং ভোটের ফল ঘোষণার আগেই হোয়াইট হাউস সফরের ঘোষণাও দেন। নির্বাচনের পর তাকাইচি ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং দুই দেশের জোট আরও শক্তিশালী করতে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবেন।
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গভীর আস্থা ও দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বিপুল এবং জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, যা এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
















