লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য; ঘন ঘন বিরতিই সুস্থ মস্তিষ্কের চাবিকাঠি
অফিস ডেস্ক, গাড়ির স্টিয়ারিং বা ঘরের সোফায়—যেখানেই হোক না কেন, দীর্ঘ সময় টানা বসে থাকা কেবল আপনার পেশি বা হাড়ের জয়েন্টকেই শক্ত করে দিচ্ছে না, এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে আপনার মস্তিষ্ককে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা বসে থাকার ফলে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের গতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, যা আপনার চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে শ্লথ করে দেয়। তবে আশার কথা হলো, এই ক্ষতি এড়াতে জিম বা ভারী ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রতি ৩০ মিনিট পর মাত্র ২ মিনিটের হালকা হাঁটাহাঁটি বা ‘ওয়াকিং অন দ্য স্পট’ মস্তিষ্কের এই রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম। গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় বিরতিহীন কাজের চেয়ে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া আপনার মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির গবেষক সোফি ই. কার্টারের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি ‘জার্নাল অফ অ্যাপ্লাইড ফিজিওলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার মূল দিকগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ হ্রাসের ভয়ংকর চিত্র
গবেষণায় ১৫ জন সুস্থ অফিস কর্মীর ওপর ৪ ঘণ্টা ধরে পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। এতে দেখা গেছে:
- ৩.২ শতাংশ হ্রাস: কোনো বিরতি ছাড়া একটানা বসে থাকলে মস্তিষ্কের মধ্যম ধমনীতে (Middle Cerebral Artery) রক্ত প্রবাহের গতি ৩.২ শতাংশ কমে যায়।
- প্রভাব: রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ার ফলে দীর্ঘ ড্রাইভিং বা কাজের সময় রিঅ্যাকশন স্পিড বা দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায় এবং সহজ কাজগুলোও কঠিন মনে হতে থাকে।
- ঝুঁকি: গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদী রক্ত প্রবাহের ঘাটতি পরবর্তীতে স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
২ মিনিটের জাদুকরী সমাধান
গবেষকরা তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার ফলাফল তুলনা করেছেন:
১. টানা ৪ ঘণ্টা বসা: রক্ত প্রবাহ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
২. প্রতি ২ ঘণ্টায় ৮ মিনিট হাঁটা: দীর্ঘ সময়ের বিরতি রক্ত প্রবাহের ঘাটতি পুরোপুরি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।
৩. প্রতি ৩০ মিনিটে ২ মিনিট হাঁটা: সবচেয়ে কার্যকর ফলাফল পাওয়া গেছে এই পদ্ধতিতে। এটি কেবল রক্ত প্রবাহের ঘাটতিই মেটায় না, বরং মস্তিষ্কে সঞ্চালন আরও কিছুটা বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: কী করবেন?
কার্ডিওভাসকুলার ফিজিওলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডিক থিজসেন বলেন, “যেকোনো ধরণের নড়াচড়া না নড়াচড়ার চেয়ে ভালো।” যারা ডেস্কে কাজ করেন তাদের জন্য তাঁর পরামর্শ:
- ইমেলের বদলে হাঁটা: সহকর্মীকে ইমেল না পাঠিয়ে সরাসরি তাঁর ডেস্কে গিয়ে কথা বলুন।
- সিঁড়ি ব্যবহার: লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহারের অভ্যাস করুন।
- ওয়াকিং মিটিং: সম্ভব হলে হাঁটতে হাঁটতে মিটিং বা লাঞ্চ সম্পন্ন করুন।
- জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁটা: যদি ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ না থাকে, তবে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ২ মিনিট মার্চ করার মতো করে হাঁটুন। এমনকি পা নাড়াচড়া (Fidgeting) করলেও রক্ত সঞ্চালন সচল থাকে।
কেন ঘন ঘন বিরতি জরুরি?
গবেষণার উপসংহার অনুযায়ী, দীর্ঘ বিরতির চেয়ে ঘন ঘন ছোট বিরতি মস্তিষ্কের ‘ভাস্কুলার ফাংশন’ বা রক্তনালীর কার্যকারিতা সচল রাখতে বেশি কার্যকর। বিশেষ করে সুস্থ অফিস কর্মীদের জন্য এই অভ্যাসটি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
















