বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্ম বড় ভূমিকা রেখেছিল। সেই আন্দোলনের জোয়ারে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনা। কিন্তু এক বছরের মাথায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সেই তরুণদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিরাই আবার ক্ষমতায় ফেরার পথে এগিয়ে রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন দ্রুতই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে স্বৈরশাসনের অবসান। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সরকার ভেঙে পড়ে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
এই আন্দোলনের সময় রাহাত হোসেন নামে এক তরুণ তার আহত বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। তার বন্ধু ইমাম হাসান তাইম ভুঁইয়া পরে হাসপাতালে মারা যান। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও তীব্র হয়।
সরকার পতনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, তরুণদের নেতৃত্বে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। ছাত্র আন্দোলনের নেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদেও জায়গা পান। কিন্তু নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসতেই সেই আশায় ফাটল ধরেছে।
ছাত্রদের গড়ে তোলা নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি ভেতরের বিভক্তি ও অভিজ্ঞতার অভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। দলটির বহু নারী নেত্রী অভিযোগ করেছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের পাশে ঠেলে রাখা হচ্ছে। এ কারণে একাধিক নারী নেতা দল ছেড়ে দিয়েছেন।
এ অবস্থায় অনেক তরুণ ভোটার ঝুঁকছেন পুরোনো ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামি-র দিকে। দলটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকার কারণে দীর্ঘদিন বিতর্কিত হলেও তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ সেই ইতিহাসকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের কাছে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও হাসিনা সরকারের দমননীতির শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা বেশি প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার বহু বছর পর প্রথমবারের মতো ঢাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতপন্থি প্রার্থীদের জয় তরুণদের রাজনৈতিক মনোভাবের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
নতুন দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়লেও এই সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জোটের প্রার্থীদের মধ্যে নারী প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম হওয়ায় আন্দোলনের সময় সামনে থাকা নারীরা নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দল নিষিদ্ধ থাকায় সবচেয়ে লাভবান হচ্ছে পুরোনো বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দলটি নিজেদের উদার গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে নতুনভাবে তুলে ধরছে এবং ছাত্রদের দলকে কোণঠাসা করছে।
বিএনপিও অবশ্য রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকার থেকে মুক্ত নয়। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে। তবুও অনেক ভোটার মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপিই সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্প।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ ইউনূস-এর সরকার নিয়েও তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। আন্দোলনের মাধ্যমে যে সমতা ও ন্যায়ের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা এখনো বাস্তব রূপ পায়নি বলে অভিযোগ।
আসন্ন নির্বাচনে তরুণদের বিপ্লব রাজনৈতিক রূপ পায় কি না, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোই আবার আধিপত্য বজায় রাখে—সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা আর বেশি দিনের নয়। অনেকের ভাষায়, স্বৈরশাসকের পতন হলেও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এখনো অপূর্ণ।
















