আসন্ন নির্বাচনকে ‘একতরফা’ আখ্যা; ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে জয় ও রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ দায় ব্যক্তিগতভাবে নিজের কাঁধে নিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) কলকাতার আইসিসিআর মিলনায়তনে আয়োজিত এক গ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান বক্তার ভাষণে তিনি এই নজিরবিহীন স্বীকারোক্তি দেন। জয় বলেন, “নিরপরাধ ছাত্র ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির দায় আমি নিজেই নিচ্ছি।” আন্দোলনের সময় সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, সরকার কখনোই মৃত্যু চায়নি, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ‘একতরফা’ ও প্রগতিশীল রাজনীতি বর্জিত বলে আখ্যা দেন তিনি। জয়ের এই খোলামেলা বক্তব্য এবং কলকাতার মাটিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে এমন চর্চা দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কলকাতার বিজেপি ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক মঞ্চ ‘খোলা হাওয়া’ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। জয়ের এই বক্তব্য নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনেও দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
জুলাই আন্দোলন ও ‘ব্যর্থতা’র কবুলনামা
বক্তব্যের শুরুতেই সজীব ওয়াজেদ জয় কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী সহিংসতার প্রসঙ্গ টানেন:
- ব্যক্তিগত দায়: জয় বলেন, “আন্দোলনের সময় অনেক নিরপরাধ মানুষ মারা গেছে। এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। সেই মৃত্যুর পূর্ণ দায় আমার।”
- রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা: তিনি স্বীকার করেন যে, কোটা ইস্যুটি আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া সরকারের ভুল ছিল। এটি আরও সংবেদনশীলভাবে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন ছিল।
- জঙ্গি অনুপ্রবেশের দাবি: জয় দাবি করেন, আন্দোলনকারী ছাত্ররা জঙ্গি ছিলেন না, তবে কট্টরপন্থি ও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো আন্দোলনের আড়ালে ঢুকে পরিস্থিতি সহিংস করে তুলেছিল। শেখ হাসিনার অডিও রেকর্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, থানায় হামলা ও অরাজকতা ঠেকাতেই কঠোর হতে হয়েছিল।
নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ: ‘একতরফা’ ভোটের চিত্র
বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়ে জয় বলেন:
১. আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ: “আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ ১৫ আগস্টের পরের হত্যাকাণ্ডগুলোর দায় কেউ নিচ্ছে না।”
২. অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা: জয়ের দাবি, শুধু আওয়ামী লীগ নয়, প্রগতিশীল অন্যান্য দল ও জাতীয় পার্টিকেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে এই নির্বাচন এখন কার্যত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি একতরফা লড়াই।
৩. ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি: তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জামায়াত ও বিএনপি ক্ষমতায় এলে পাকিস্তান সুযোগ পাবে এবং ভারতের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
কলকাতার রাজনীতিতে উত্তাপ
জয়ের এই ভাষণকে কেন্দ্র করে কলকাতার রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তুঙ্গে:
- তৃণমূল কংগ্রেস: তৃণমূলের এক বিধায়ক মন্তব্য করেছেন, সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে এমন বিতর্কিত রাজনৈতিক ভাষণ উত্তেজনা বাড়াতে পারে, তবে সবার মত প্রকাশের অধিকার আছে।
- বিজেপি: বিজেপি প্রতিনিধি পঙ্কজ রায় বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখা উচিত, যদিও এটি একটি বই প্রকাশনা অনুষ্ঠান ছিল।
- বিশ্লেষক মতামত: প্রখ্যাত সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল মনে করেন, সাহিত্যিক আলোচনার আড়ালে এটি ছিল স্পষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা, যা কলকাতার জনমতকে বিভক্ত করেছে।
পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে
ক্ষমতাচ্যুত শাসক দলের শীর্ষ নেতার বিদেশের মাটিতে এমন ‘দায় স্বীকার’ ও ‘একতরফা নির্বাচন’-এর অভিযোগকে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে ভারতের মাটিতে এমন বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
















