ফেসবুক-টেলিগ্রামে পাতা হচ্ছে ঋণের জাল; নেপথ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ক্যামিং সেন্টার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র
অনলাইনে ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশে জেঁকে বসেছে ভয়ংকর এক ডিজিটাল স্ক্যামিং নেটওয়ার্ক। রাজবাড়ীতে কর্মরত একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের হিসাব শাখার ডেপুটি ম্যানেজার মো. মাসুদ সম্প্রতি এই চক্রের খপ্পরে পড়ে খুইয়েছেন ৬০ লাখ টাকা। ফেসবুক মেসেঞ্জারে ‘পার্টটাইম জব’ এবং সিনেমার রেটিং দেওয়ার নাম করে তাকে এই ফাঁদে ফেলা হয়। লভ্যাংশ দেওয়ার নামে ধাপে ধাপে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ১ কোটি টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় চক্রটি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো জালিয়াতি নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে অবস্থিত শক্তিশালী ‘স্ক্যামিং সেন্টার’। এসব কেন্দ্রে অনেক বাংলাদেশিকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সাইবার অপরাধে বাধ্য করা হচ্ছে। সিআইডি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে খোদ বাংলাদেশিরাই বিদেশে বসে নিজ দেশের নাগরিকদের পকেট কাটছে।
ভুক্তভোগী মো. মাসুদ রাজধানীর বাড্ডা থানায় জিডি এবং সিআইডিতে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এদিকে ২১ ও ২২ জানুয়ারি মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া থেকে উদ্ধার হওয়া ২৮ জন বাংলাদেশি ফিরে এসে বর্ণনা করেছেন তাদের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা।
যেভাবে পাতা হয় ‘মধুচক্রের’ ফাঁদ
তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির মতে, ডিজিটাল স্ক্যামিংয়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত:
- প্রাথমিক প্রলোভন: ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে ইনভাইটেশন পাঠিয়ে সিনেমার রেটিং বা ইউটিউবে লাইক-শেয়ারের বিনিময়ে আয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
- আস্থার সঞ্চার: শুরুতে ৮০০ বা ১০০০ টাকা বোনাস দিয়ে ভিকটিমের বিশ্বাস অর্জন করা হয়।
- জমার অঙ্ক বৃদ্ধি: এরপর ‘ওয়ার্কিং আউটলেট আইডি’ সচল রাখতে বা মার্চেন্ট ফি দেওয়ার নাম করে ৫ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত চাওয়া হয়।
- চূড়ান্ত প্রতারণা: জমার অংক ও লভ্যাংশ যখন বিশাল আকার ধারণ করে, তখন সেই টাকা তোলার জন্য ইনস্যুরেন্স বা ভ্যাট দেওয়ার অজুহাতে আরও টাকা হাতিয়ে নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিদেশের ‘স্ক্যাম সেন্টার’: নতুন যুগের দাসপ্রথা
মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া থেকে ফেরা হাবিবুর রহমান ও মেহরাজ হাসানের বক্তব্যে উঠে এসেছে আধুনিক দাসত্বের চিত্র:
১. জোরপূর্বক প্রশিক্ষণ: ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ড হয়ে অবৈধ পথে মিয়ানমারের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে সাইবার অপরাধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
২. অমানুষিক নির্যাতন: নির্দিষ্ট সংখ্যক ফোন নম্বর সংগ্রহ করতে না পারলে বা কাজ করতে অস্বীকার করলে রোদে দৌড়ানো, ভারী ওজন বহন এবং অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
৩. অস্ত্রের মুখে জিম্মি: দুবাই বা মালয়েশিয়ায় কর্মরত শ্রমিকদের ‘বেশি বেতনের’ লোভ দেখিয়ে এসব সেন্টারে পাচার করা হচ্ছে।
সিআইডির উদ্বেগ ও আইনি পদক্ষেপ
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তালেব জানিয়েছেন, স্ক্যামাররা বাংলাদেশি নাগরিকদের ফোর্স ইনভেস্টমেন্ট, ব্ল্যাকমেইল ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে:
- টাকা পাচার: যেসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হচ্ছে, সেগুলো মূলত ভুয়া নামে খোলা। টাকা জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
- বিশেষ সতর্কতা: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে (কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম) যাওয়ার ক্ষেত্রে বা অনলাইনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উদ্ধার ও প্রশাসনিক তৎরতা
গত ২২ জানুয়ারি মিয়ানমার থেকে ৮ জন এবং ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে আরও ২০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যাংককের বাংলাদেশ দূতাবাস ইতোমধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় এই অপরাধ চক্রকে চিহ্নিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে। কুষ্টিয়া ও কিশোরগঞ্জে এ সংক্রান্ত দুটি মামলার তদন্ত চলছে এবং সিআইডি একটি মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছে।
















