ইসলামাবাদ—বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক সহিংস হামলা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছে খনিজসম্পদ এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের যে আশ্বাস ইসলামাবাদ দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে এই প্রদেশের অস্থিরতা।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী দেশটির খনিজসম্পদ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দেন। সেই প্রতিশ্রুতির কয়েক মাসের মধ্যেই বেলুচিস্তানে একযোগে হামলায় ৩১ জন বেসামরিক মানুষ ও ১৭ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন। সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারান আরও ১৪৫ জন হামলাকারী।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় আয়তনের কিন্তু সবচেয়ে দরিদ্র এই প্রদেশে রয়েছে দেশের সমৃদ্ধ তেল, গ্যাস, তামা, সোনা ও কয়লার ভাণ্ডার। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার মানুষ অভিযোগ করে আসছেন, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সম্পদ ব্যবহার করলেও স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এই ক্ষোভ থেকেই কয়েক দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে।
সাম্প্রতিক হামলার দায় স্বীকার করেছে বেলুচ লিবারেশন আর্মি। সরকার দ্রুত প্রতিবেশী দেশকে দায়ী করলেও কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিক থেকে দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বেলুচিস্তানের সংকট কোনো সাময়িক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং কঠোর নিরাপত্তা নীতির ফল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এ অঞ্চলে হাজারো মানুষ গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে, যা ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
চীন বহু বছর ধরে বেলুচিস্তানে বড় বিনিয়োগ করছে, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রবন্দর গওয়াদার এবং অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি খনি কোম্পানি সম্প্রতি খনিজ অনুসন্ধানে বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। তবে সহিংসতা বাড়তে থাকলে এসব প্রকল্পের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তি হওয়ায় চীন বা যুক্তরাষ্ট্র সহজে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে লাগাতার হামলা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে করে তুলবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচ ও ঝুঁকি বাড়াবে।
পাকিস্তানের অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় চাপের মধ্যে ছিল। আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তায় কিছুটা স্থিতি ফিরলেও বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় অনেক কম।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, বেলুচিস্তানের সহিংসতা শুধু নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখলে সমাধান হবে না। স্থানীয় মানুষের আস্থা ফেরানো, রাজনৈতিক সংলাপ এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া এই প্রদেশে টেকসই স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিক প্রভাবের অভিযোগ কূটনৈতিকভাবে সুবিধা দিলেও মূল সমস্যা অভ্যন্তরীণ। সরকার যদি স্থানীয় ক্ষোভ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে বিদেশি শক্তি সেই দুর্বলতা কাজে লাগাতে পারে। ফলে বেলুচিস্তানের অস্থিরতা শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাই নয়, দেশটির আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
















