ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই বাজেটে অবকাঠামো ব্যয় বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং দেশীয় উৎপাদন শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশটির অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় রপ্তানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় এর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
বাজেটে আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়ে আগামী অর্থবছরে ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের মোট ব্যয় ও আয়ের ব্যবধানকেই রাজস্ব ঘাটতি হিসেবে ধরা হয়।
অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ে রেকর্ড বরাদ্দ
সড়ক, বন্দর ও রেল প্রকল্পে বিনিয়োগ গত এক দশক ধরেই বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার। নতুন বাজেটেও এই ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া অর্থবছরে মূলধনী ব্যয়ের লক্ষ্য প্রায় ৯ শতাংশ বাড়িয়ে ১২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন রুপিতে উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক উত্তেজনার কারণে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ২০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে।
বিরল খনিজ ও কৌশলগত খাতে উৎপাদন জোরদার
দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে মন্দা দেখা দেওয়ায় সরকার সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার, বস্ত্র ও বিরল খনিজসহ সাতটি কৌশলগত খাতে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। তামিলনাড়ু, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় বিরল খনিজের জন্য বিশেষ করিডর গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত নভেম্বরে বিরল খনিজ খাতে বড় প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার।
এছাড়া নতুন একটি সেমিকন্ডাক্টর মিশন চালু করা হয়েছে, যার আওতায় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করা হবে। বিদেশি ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ২০৪৭ সাল পর্যন্ত করছাড়ের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে, যাতে ডেটা সেন্টার বিনিয়োগ আরও বাড়ে। ইতোমধ্যে গুগলের মতো বড় প্রতিষ্ঠান ভারতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
নতুন করছাড় নেই
মার্কিন শুল্কের কারণে রপ্তানি চাপের মুখে পড়লেও ব্যক্তিগত আয়ে নতুন করে কোনো করছাড় ঘোষণা করা হয়নি। গত বছরই সরকার আয়কর ছাড়ের সীমা বাড়িয়েছিল এবং পণ্য ও সেবা কর কাঠামো সংস্কার করায় এবার নতুন ছাড় দেওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। তবে রপ্তানিমুখী খাত যেমন সামুদ্রিক খাদ্য শিল্প ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে কিছু শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব শৃঙ্খলায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সরকার বার্ষিক ঘাটতির লক্ষ্যের বদলে মোট ঋণ ও জিডিপির অনুপাতের দিকে নজর দেবে। ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে এই অনুপাত ৫৬ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এই অনুপাত ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নামার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বাজারে হতাশা
আর্থিক শৃঙ্খলার বার্তা স্পষ্ট হলেও বাজেট ঘোষণার দিনে শেয়ারবাজারে বড় ধস দেখা যায়। ফিউচার ও অপশন লেনদেনে সিকিউরিটিজ ট্রানজ্যাকশন ট্যাক্স বাড়ানোয় বিনিয়োগকারীরা হতাশ হন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে লেনদেন ব্যয় বাড়বে এবং ডেরিভেটিভ বাজারে কার্যক্রম কিছুটা কমে যেতে পারে।















