পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ; মেগা প্রকল্পের বদলে ফলাফল-মুখী সংস্কারে গুরুত্ব সরকারের
দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ২.৩ ট্রিলিয়ন (২ লাখ ৩০ হাজার কোটি) টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এটি প্রায় ১৮.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য। পূর্ববর্তী অর্থবছরের ২.৭ ট্রিলিয়ন টাকার তুলনায় এবারের এডিপির আকার কিছুটা সংকুচিত হলেও, এটিকে আরও বাস্তবসম্মত ও ফলাফল-মুখী হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা। উন্নয়ন বাজেটের এই বিশাল অংকের মধ্যে ১.৪ ট্রিলিয়ন টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ৮৬০ বিলিয়ন টাকা বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে সংস্থান করা হবে। মোট ১,১৭১টি উন্নয়ন প্রকল্পকে অন্তর্ভুক্ত করে সাজানো এই এডিপিতে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে জনকল্যাণমূলক ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোতে নজর দিয়ে এক নতুন অর্থনৈতিক পথরেখা তৈরি করছে সরকার।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের এডিপিতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। রাজস্ব-ভিত্তিক এবং সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়ক প্রকল্পগুলোকেই কেবল অর্থায়ন করা হচ্ছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দের চিত্র: ৫ খাতেই ৭০ শতাংশ ব্যয়
এবারের উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হবে পাঁচটি প্রধান খাতে:
১. পরিবহন ও যোগাযোগ: ৫৯১.৭ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ দিয়ে এই খাতকে শীর্ষ তালিকায় রাখা হয়েছে। ভাঙাচোরা সড়ক মেরামত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এর মূল লক্ষ্য।
২. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: ৩২৩.৯ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে।
৩. শিক্ষা: ২৮৫.৬ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম ও চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (PEDP-4) ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
৪. আবাসন ও সামাজিক সুবিধা: ২২৭.৮ বিলিয়ন টাকা রাখা হয়েছে আবাসন সমস্যার সমাধান ও কমিউনিটি সুবিধার জন্য।
৫. স্বাস্থ্য: ১৮১.৫ বিলিয়ন টাকা রাখা হয়েছে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং জেলা পর্যায়ে হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়নের জন্য।
মেগা প্রকল্প পরিহার ও নতুন কৌশল
সরকার চলতি অর্থবছরে নতুন কোনো ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প গ্রহণ না করার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে জাপান সরকারের অর্থায়নে চলমান মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অব্যাহত থাকবে। সরকারের এই ‘ফলাফল-মুখী’ কৌশলের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- রাজস্ব বৃদ্ধি: যেসব প্রকল্প সরাসরি সরকারের আয় বাড়াতে সহায়তা করবে, সেগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
- বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস: মোট বাজেটের বড় অংশ (প্রায় ৬১%) অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
- সামাজিক সুরক্ষা: শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জনসেবামূলক খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২.৩ ট্রিলিয়ন টাকার এই বিশাল বরাদ্দ বাস্তবায়ন করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রকল্প পরিচালকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে বরাদ্দ বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। এটি নিশ্চিত করা গেলে এডিপি বাস্তবায়নে গতি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
















