নরওয়ের ইতিহাসের অন্যতম বড় ধর্ষণ মামলার বিচার শুরু হতে যাচ্ছে রাজধানী অসলোতে। অভিযুক্ত মারিয়ুস বর্গ হইবি আদালতে দাঁড়ালেও তার পাশে থাকছেন না রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ কেউই। তার মা ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিত কিংবা সৎপিতা ও নরওয়ের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ক্রাউন প্রিন্স হাকন—কেউই আদালতে উপস্থিত থাকবেন না।
আগামী সাত সপ্তাহ চলবে এই বিচার। আদালতের নির্দেশে অভিযুক্তের কোনো ছবি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ব্যাপক উপস্থিতিতে বিষয়টি নরওয়ের রাজপরিবারকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে।
ঊনত্রিশ বছর বয়সী মারিয়ুস বর্গ হইবির বিরুদ্ধে মোট আটত্রিশটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে চারজন নারীকে ধর্ষণ, এক বান্ধবীকে মারধর ও হুমকি দেওয়া, তার ফ্ল্যাট ভাঙচুর, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ ও গাড়ি চালানো সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার দশ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড হতে পারে।
রাজপ্রাসাদ বারবার বলছে, মারিয়ুস রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক সদস্য নন এবং তিনি কোনো জনপরিচিত ব্যক্তিত্বও নন। তবে বাস্তবে তিনি রাজপরিবারের খুব কাছের একজন হিসেবে পরিচিত। ক্রাউন প্রিন্স হাকন তাকে নিজের সন্তানের মতো দেখেন এবং রাজা হারাল্ড পঞ্চমের কাছেও তিনি নাতির মতোই বড় হয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এটি নরওয়ের রাজপরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। এর আগে এমন মাত্রার অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়নি রাজপরিবারকে।
মারিয়ুস কিছু অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো অভিযোগ স্বীকার করেছেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি শারীরিক নির্যাতন ও সম্পত্তি ভাঙচুরের বিষয়টি মেনে নেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তিনি একটি ঝাড়বাতি ভেঙে ফেলেন, দেয়ালে ছুরি ছুড়ে মারেন এবং আয়না ভাঙেন। একই সঙ্গে ওই নারীকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন।
ধর্ষণের অভিযোগগুলোর সময়সীমা দুই হাজার আঠারো থেকে দুই হাজার চব্বিশ সালের মধ্যে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় বলা হয়েছে, এক নারী ঘুমন্ত অবস্থায় যৌন নির্যাতনের শিকার হন। নরওয়ের আইনে এটি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য।
একাধিক নারী এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন। তাদের মধ্যে কেবল একজনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। সাবেক বান্ধবী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত নোরা হক্লান্ড আদালতে গোপনীয়তা চাইলেও তা নাকচ হয়। তার অভিযোগের মধ্যেই রয়েছে মারধর, শ্বাসরোধ এবং অপমানজনক ভাষায় গালিগালাজের ঘটনা।
মারিয়ুসের আইনজীবীরা ধর্ষণ ও গুরুতর সহিংসতার অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। সম্প্রতি যুক্ত হওয়া বিপুল পরিমাণ গাঁজা পরিবহনের অভিযোগও তারা মানেননি।
ক্রাউন প্রিন্স হাকন বিচার শুরুর আগে সাংবাদিকদের বলেন, মারিয়ুস তাদের পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে তিনি ভুক্তভোগী নারী ও তাদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতির কথা জানান এবং বলেন, তারা যে কঠিন সময় পার করছেন তা পরিবারটি উপলব্ধি করে।
রাজা হারাল্ড ও রানি সোনিয়া, দুজনেরই বয়স আটাশি। তারাও আদালতে উপস্থিত থাকবেন না। বরং তারা এই সময়ে শীতকালীন অলিম্পিক উপলক্ষে ইতালি সফরে যাবেন।
ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিত গুরুতর ফুসফুসের রোগে ভুগছেন এবং তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। চিকিৎসকরা তাকে ফুসফুস প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাজপরিবারের কাছে এই স্বাস্থ্যসংকট এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি এক প্রামাণ্যচিত্রে মেটে-মারিত নিজেই সন্তানের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, একজন মা হিসেবে সবসময় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এবং পেশাদার সহায়তা নিয়েছেন। তবে এ নিয়ে যেভাবে কঠোর সমালোচনা করা হচ্ছে, তা তাকে কষ্ট দিয়েছে।
নরওয়ের রাজপরিবার বরাবরই স্বচ্ছতা ও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার জন্য পরিচিত। তবে একের পর এক কেলেঙ্কারিতে সাধারণ মানুষের সমালোচনা বেড়েছে।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরেক বিতর্ক। সম্প্রতি প্রকাশিত জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত নথিতে ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিতের নামও উঠে এসেছে। জানা গেছে, তিনি এক সময় এপস্টেইনের বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। এ বিষয়ে রাজপ্রাসাদ জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তিনি আগেই দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি গভীর সহানুভূতি জানিয়েছেন।
সবকিছুর পরও নরওয়ের রাজতন্ত্র এখনো জনগণের বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় তিয়াত্তর শতাংশ মানুষ এখনো রাজতন্ত্রের পক্ষে। অনেকেই মনে করছেন, এই বিচারকে রাজপরিবারের সামগ্রিক ভূমিকার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজপরিবার জানে—এখন আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। বিচার শুরুর দিনই কাকতালীয়ভাবে নরওয়ের পার্লামেন্টে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির বিষয়ে নিয়মিত ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যদিও কেউই মনে করছেন না, সেই প্রস্তাব পাস হবে।
















