গাজা পুনর্গঠনের জন্য একটি নতুন ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটি গঠনের ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন উপত্যকাটির ২১ লাখ মানুষের মৌলিক অস্তিত্ব চরম সংকটে রয়েছে। রাষ্ট্রগুলো যখন গাজার ভবিষ্যৎ শাসন ও পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা করছে, তখন বাস্তবে চলমান কঠোর বিধিনিষেধের কারণে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার উপায়গুলো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
গাজায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও মানবিক বিপর্যয় গভীরতর হচ্ছে। অসংখ্য পরিবার এখনো আশ্রয়হীন, শিশুদের বড় একটি অংশ না খেয়ে রাত কাটাচ্ছে এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা শত শত হাজার মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। শীতকালীন বৃষ্টিতে অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরগুলো কাদার সাগরে পরিণত হয়েছে, ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ থামেনি। অক্টোবরের পর থেকে পাঁচ শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শুধু চলতি মাসেই পূর্ব গাজার সাতটি ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত স্কুল চত্বর ধ্বংস করা হয়েছে।
ইউএনআরডব্লিউএ এখনো গাজার সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত সেবা প্রদানকারী সংস্থা। উপত্যকার অর্ধেকের বেশি মানুষের জন্য এটি কার্যত সরকারি ব্যবস্থার ভূমিকা পালন করছে। সংস্থাটির প্রায় এগারো হাজার কর্মী চরম ঝুঁকি সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি সপ্তাহে প্রায় এক লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল ভবনে প্রায় সত্তর হাজার শিশুকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব স্কুলে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত পরিবার আশ্রয় নিচ্ছে।
ইউএনআরডব্লিউএ পানির সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও করছে, যা অর্ধেকের বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য অপরিহার্য। এখানে সেবা মানে কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং টিকাদান কেন্দ্র, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য শ্রেণিকক্ষ এবং খাদ্য সহায়তার বিতরণকেন্দ্র।
তবে এই কার্যক্রম গুরুতর বাধার মুখে পড়েছে। গাজায় পণ্য প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং দখলদার শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বন্ধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক কর্মীদের গাজায় প্রবেশও নিষিদ্ধ, ফলে মাঠপর্যায়ের কাজ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতি শিশুদের ক্ষেত্রে। প্রায় সাত লাখ শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। যুদ্ধের আগে ইউএনআরডব্লিউএ তিন লাখ শিশুকে শিক্ষা দিত, যা প্রাথমিক শিক্ষার বড় অংশ ছিল। প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটিকে আবার এই কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হচ্ছে না।
সংস্থাটি শিশুদের জন্য স্বাভাবিকতার কিছুটা পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে একটি শিক্ষা পুনরারম্ভ উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বিধিনিষেধের কারণে অধিকাংশ শিশু এখনো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সময় কাটাচ্ছে। এটি তাদের ভবিষ্যতের ওপর ধারাবাহিক আঘাত।
শুধু ইউএনআরডব্লিউএই নয়, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়াও কার্যত অবরোধে পরিণত হয়েছে। তথাকথিত দ্বৈত ব্যবহারের অজুহাতে আশ্রয় ও নির্মাণসামগ্রী আটকে দেওয়া হচ্ছে, ফলে পুনর্গঠন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব বাধা নিছক প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের টিকে থাকার উপায়গুলো ধ্বংসের একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। প্রতিটি বাধা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের প্রমাণকে আরও শক্তিশালী করছে।
ইউএনআরডব্লিউএ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা প্রদানে প্রমাণিত সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং গাজার মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এই সংস্থার কার্যক্রম বজায় রাখা গাজার ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
এই সংকট কেবল একটি সংস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। মানবিক সহায়তায় বাধা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, বৈশ্বিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করছে।
ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অধিকাংশ রাষ্ট্র ইউএনআরডব্লিউএর মেয়াদ নবায়নের পক্ষে ভোট দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। পরিস্থিতি এখন স্পষ্ট—গাজার জীবনরেখা কেটে যেতে দেওয়া হবে, নাকি সম্মিলিতভাবে তা রক্ষা করা হবে। গাজার টিকে থাকা ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রমের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এটি রক্ষা করা মানে মানবতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং নিষ্ঠুরতার বদলে সহমর্মিতার পক্ষে দাঁড়ানো।
















