যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে হুমকি ও অনিশ্চয়তার কৌশল নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল স্বল্পমেয়াদে চাপ তৈরি করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফল বয়ে আনার ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ মনে করে তাদের হারানোর আর কিছু নেই।
দুই হাজার পঁচিশ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর ট্রাম্প শান্তির বার্তা দিয়েছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি আরও বড় হামলার হুমকি দিচ্ছেন এবং সেই হুমকির পক্ষে ইরানের কাছাকাছি অঞ্চলে বিমানবাহী রণতরীসহ বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চাপের উদ্দেশ্য ইরানকে একটি নতুন সমঝোতায় বাধ্য করা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য ওই সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যত বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের দাবি থাকতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই কৌশল ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির পরিচিত ধারা। এতে সামরিক হুমকি, সীমিত হামলা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করে প্রতিপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে তিনি প্রকাশ্যে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে না থাকলেও সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচও করেন না।
এই ধরনের নীতিকে অনেকেই ‘উন্মাদ কৌশল’ হিসেবে আখ্যা দেন। ধারণাটি অনুযায়ী, প্রতিপক্ষকে এমন অবস্থায় ফেলা হয় যাতে তারা নিশ্চিত হতে না পারে, যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যেতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনাকে এই কৌশলের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। সে সময় সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলেও ইরান পাল্টা জবাব না দেওয়ায় ট্রাম্প এটিকে নিজের শক্ত অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে এই নীতি আরও জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। এতে একদিকে ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননের মতো দেশে সীমিত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ইরানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখা হচ্ছে।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে কাজ করছে। সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং সেখানে জঙ্গিবাদ ঠেকানো ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
লেবানন ও গাজায় ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলছে, অন্যদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবি তুলছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ এসব গোষ্ঠীর অস্ত্রই তাদের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের মূল ভিত্তি।
ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। তেহরান মনে করছে, অতীতে আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও একই আচরণ করতে পারে। ফলে ইরানি নেতৃত্ব ছাড় দেওয়াকে আরও চাপ বাড়ার সংকেত হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থায় ট্রাম্পের কৌশল একটি সীমা পর্যন্ত কাজ করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিপক্ষ বিশ্বাস করে যে তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে, তাহলে তারা আপসের পথে না গিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ছাড় আদায় সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ‘উন্মাদ কৌশল’ মধ্যপ্রাচ্যে আরও অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে, যার পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
















