প্রজাতন্ত্রের কর্মীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে নিষেধাজ্ঞা; প্রয়োজনে আইন সংশোধনের কথা ভাবছে সরকার
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে এক অভূতপূর্ব আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচার চালানোকে ‘দণ্ডনীয় অপরাধ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইসি। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকল রিটার্নিং কর্মকর্তাকে পাঠানো এক চিঠিতে ইসি স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কেউ কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করা হয়েছে, যেখানে খোদ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ভোটের মাত্র ১২ দিন আগে ইসির এই হার্ডলাইন সরকারের উচ্চপর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ ও অস্বস্তি তৈরি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে সরকার প্রয়োজনে গণভোট অধ্যাদেশ সংশোধনের চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশনের এই নির্দেশনার ফলে মাঠপর্যায়ে সরকারি অফিস, ব্যাংক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টাঙানো হাজার হাজার ব্যানার ও বিলবোর্ড এখন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইসির আইনি ব্যাখ্যা ও নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ এবং সচিবালয় থেকে জারিকৃত চিঠিতে বিষয়টি অত্যন্ত কঠোরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
- অপরাধের ধারা: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচার কাজ গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ২১ ধারা এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৮৬ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
- ভোটের প্রভাব: ইসি মনে করে, সরকারি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ জনগণের রায়কে প্রভাবিত করতে পারে, যা একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিপন্থী।
- সীমানা নির্ধারণ: কমিশন জানিয়েছে, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রচার চালাতে পারলেও বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সরকারের অবস্থান ও পাল্টা কৌশল
সরকারের পক্ষ থেকে এই নির্দেশনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, তারা ইসির চিঠি পেয়েছেন এবং আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকারের ভেতরকার সূত্রে জানা গেছে:
১. অধ্যাদেশ সংশোধন: ইসি যে আইনের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেটি সংশোধন করে সরকারি প্রচারণাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার একটি প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদে আলোচিত হচ্ছে।
২. বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন: গণভোটের প্রচারের জন্য ইতিমধ্যে ১৪০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। সরকারি দপ্তরগুলোতে দৃশ্যমান প্রচারসামগ্রী সরালে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন।
মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ও জট
ইসির নির্দেশনায় শাস্তির কথা বলা হলেও আগে থেকে টাঙানো প্রচারসামগ্রী কে সরাবে—তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। ইসি সচিবালয় জানিয়েছে, এগুলো অপসারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর। ফলে স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরণের সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে।
গণভোটের মূল বিষয়বস্তু
এবারের গণভোটে ভোটাররা একটিমাত্র প্রশ্নের মাধ্যমে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন:
- তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণ।
- সংসদকে দুই কক্ষবিশিষ্ট করার প্রস্তাব।
- জুলাই সনদের ৩০ দফা সংস্কার বাস্তবায়ন।
- অন্যান্য মৌলিক সংস্কার প্রতিশ্রুতি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার বঞ্চিত হওয়ার পর এই গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের পথরেখা নির্ধারণ করবেন। তবে ইসি ও সরকারের এই দূরত্ব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
















