ইরানের উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আরব সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান বাহিনীর অস্বাভাবিক সমাবেশ ইরানে সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত দিতে পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকনসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ আরব সাগরে মোতায়েন করেছে। গত বছরের জুনে ইরান–ইসরাইল সংঘাতের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছিল, যার পরিণতিতে ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালানো হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ক্যারিবীয় অঞ্চলেও যুক্তরাষ্ট্র বড় সামরিক শক্তি জড়ো করেছিল। সেই সমাবেশের কয়েক সপ্তাহ পর ভেনেজুয়েলার নৌযানে হামলা চালানো হয় এবং পরে জানুয়ারির শুরুতে সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে তুলে আনার ঘটনা ঘটে।
ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে প্রতিবাদ হলেও পরে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের তথ্যমতে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হন এবং আরও হাজার হাজার মানুষ আটক হন।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের শাসকদের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, সহায়তা আসছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পরে তিনি দাবি করেন, ইরান সরকার আশ্বাস দেওয়ায় হুমকি কিছুটা কমানো হয়েছে। তবে বিক্ষোভ দমনের পরও ট্রাম্পের বক্তব্য ও সামরিক সমাবেশ পরিস্থিতিকে আবার উত্তপ্ত করে তুলেছে।
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক মন্তব্যে বলেন, প্রয়োজন হলে ব্যবহারের জন্যই এই সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়, তবে সামরিক প্রতিক্রিয়া গত জুনের হামলাকেও তুচ্ছ মনে করাবে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকন মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারের জন্য। এই রণতরীটি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে যাত্রা করে সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগরে দায়িত্ব পালন করছিল। একই সময়ে মার্কিন বিমান বাহিনী মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক দিনের প্রস্তুতিমূলক মহড়া শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে তাদের ঘাঁটি আছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান কাতারের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
আব্রাহাম লিংকন রণতরীটি একটি ভাসমান বিমানঘাঁটির মতো কাজ করে। এতে ছয় থেকে সাত হাজার নাবিক ও সেনা থাকে। রণতরীর সঙ্গে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার ও যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনও মোতায়েন থাকে, যেগুলো ভূমিতে নিখুঁত হামলা চালাতে সক্ষম।
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র একযোগে ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায়। গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় শক্তিশালী বাংকার বিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়। এই অভিযানে শতাধিক যুদ্ধবিমান ও হাজারো সেনা অংশ নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সামরিক সমাবেশ ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত হলেও নতুন হামলার প্রস্তুতি হতে পারে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক দমন–পীড়নের পর। ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষক এলি জেরানমায়েহ সতর্ক করে বলেন, মানবাধিকার রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে হামলা চালানো হলেও এর ঝুঁকি অত্যন্ত বড়। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সেনা ও মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ইরান তেল স্থাপনা ও আন্তর্জাতিক নৌপথে আঘাত হানতে সক্ষম, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতে পারে। ইসরাইলসহ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও এর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষক আলি ভায়েজ মনে করেন, তাৎক্ষণিক হামলার সম্ভাবনা কম। তাঁর মতে, বিক্ষোভ ইতোমধ্যে দমন হয়েছে এবং মানবাধিকার অজুহাতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। তিনি বলেন, এমন হামলা ব্যয়বহুল হবে এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্যও স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক পথ ব্যর্থ হলে সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে ইরানের সাধারণ মানুষকেই। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
















