দীর্ঘ সতেরো বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তারেক রহমান। কণ্ঠস্বর হারানো এই নেতা এখনো নিজের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে সতর্ক ভাষায় কথা বলছেন। একসময় যার বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ ছিল, সেই তিনি আজ বাংলাদেশের কার্যত প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবে সামনে এগিয়ে আসছেন।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরার সময় বিমানবন্দরে লক্ষাধিক সমর্থকের উপস্থিতি তার জনপ্রিয়তার স্পষ্ট বার্তা দেয়। ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তাঁর মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। শোকের মাঝেই তারেক রহমান জানান, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, বরং দায়িত্ব পালনের শিক্ষাই তিনি মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমান এখন সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে আলোচনায়। ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার পতনের দেড় বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তারেক রহমান নিজেকে পুরোনো রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট ও তরুণ বেকারত্বের চাপে রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক সংস্কার ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে তারেক রহমান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন।
তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে রয়েছে বিতর্ক। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পুত্র হিসেবে তাঁর উত্থান অনেকের কাছে বংশগত রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। সমর্থকদের চোখে তিনি নির্যাতিত নেতা, আর সমালোচকদের কাছে ক্ষমতার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক বিতর্কিত চরিত্র।
তারেক রহমান দাবি করেন, তিনি কেবল পারিবারিক পরিচয়ের কারণে নয়, দলীয় সমর্থনেই রাজনীতিতে আছেন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতি প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থনের তথ্য উঠে এসেছে। তবে অতীতে বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের অবস্থান নিয়ে সংস্কারপন্থীদের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
তারেক রহমান দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে কেউ সক্ষম হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাঁর আগের দণ্ডাদেশ বাতিল করা হয়েছে। তবুও জুলাই আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতার পর মানুষ নতুন নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহি ও সংস্কারের নিশ্চয়তা চাইছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। শান্তিরক্ষী মিশনে বড় অবদান, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে পররাষ্ট্রনীতি নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য আনার কথা বলছেন এবং শুল্ক ইস্যুতে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব ভোটে উঠছে। সংস্কার ব্যর্থ হলে দেশ আবার অতীতের পথে ফিরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে একে অগণতান্ত্রিক বলা হলেও সংস্কারপন্থীরা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে করছেন। তারেক রহমান নীতিগতভাবে কোনো দল নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে থাকলেও অপরাধের বিচার প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশে ইসলামপন্থার উত্থানও চোখে পড়ছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তরুণদের একাংশের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, যা সংখ্যালঘু ও নারী অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি বজায় রাখা আগামী সরকারের বড় পরীক্ষা।
ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমানকে অনেকেই শান্ত স্বভাবের, নীতিনির্ধারণে আগ্রহী নেতা হিসেবে বর্ণনা করছেন। পরিবেশ রক্ষা, নগর সবুজায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও কারিগরি শিক্ষায় সংস্কারের নানা পরিকল্পনার কথা তিনি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, পরিকল্পনার অন্তত একটি অংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেই জনগণের সমর্থন পাওয়া সম্ভব।
তবে অতীতের দুর্নীতির ছায়া, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা—এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই হবে তাঁর জন্য সবচেয়ে কঠিন। নিজেকে বদলানোর ইঙ্গিত দিয়ে তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলছেন।
নির্বাসনের জীবনের স্বাধীনতা হারালেও তারেক রহমান মনে করেন, ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে। তাঁর ভাষায়, মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, তা নির্ধারিত হবে এই নির্বাচনের মাধ্যমেই।
















