কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ উত্তর কিভুর রাজধানী গোমা দখলের এক বছর পেরিয়ে গেলেও শহরের রাস্তাঘাটে স্বাভাবিক যানবাহন ও বাজারের কোলাহল দেখা যায়। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখনো তালাবদ্ধ।
শহরের বিভিন্ন সড়কে সারিবদ্ধভাবে বন্ধ পড়ে আছে রাওব্যাংক, ইকোব্যাংক ও অ্যাকসেস ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ। গত বছরের জানুয়ারিতে এম২৩ বিদ্রোহীরা গোমা দখলের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সব ব্যাংক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনে।
কেন্দ্রীয় গোমায় নিজের ফার্মেসির সামনে বসে থাকা শেইলা জাওয়াদি জানান, ব্যাংক বন্ধ থাকায় তার ব্যবসা ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি অ্যাকসেস ব্যাংকের গ্রাহক হলেও শহর পতনের আগে কার্ড হারান এবং মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধাও নেই। ভিসা কার্ড থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে প্রতিবেশী দেশ রুয়ান্ডায় গিয়ে টাকা তুলতে হয়।
গোমা থেকে রুয়ান্ডার গিসেনি শহরে গিয়ে এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলনের সময় অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়। একশ ডলার তুলতে গুনতে হয় প্রায় পনেরো ডলার পর্যন্ত ফি। আবার রুয়ান্ডার মুদ্রায় টাকা তুলে সীমান্তের অনানুষ্ঠানিক মানি চেঞ্জারদের মাধ্যমে ডলার ও পরে কঙ্গোর মুদ্রায় রূপান্তর করতে গিয়ে প্রতিবারই ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও ব্যাংকগুলো পুনরায় চালু হয়নি। কঙ্গোর কেন্দ্রীয় সরকার ও এম২৩ প্রশাসনের মধ্যে এ নিয়ে পরস্পরকে দায়ী করার পালা চলছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে নীরব, কখনো নিরাপত্তাজনিত অস্থায়ী বন্ধের কথা বলেই দায় সারে।
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ গিসেনি-গোমা সীমান্ত পার হয়ে রুয়ান্ডার এটিএমে ভিড় করছেন। কেউ কেউ সীমান্তের শুল্ক এলাকায় বসানো এটিএম ব্যবহার করছেন। এদিকে গোমার ভেতরে অর্থনীতি পুরোপুরি নগদনির্ভর হয়ে পড়েছে, অথবা যাদের সামর্থ্য আছে তারা ইলেকট্রনিক লেনদেনে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
শহরের প্রধান বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যের দাম বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। আগে পাইকারি দামে কেনাবেচা করা গেলেও এখন ক্রেতা কম, বিক্রি কম। সবাই কোনোরকমে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক বন্ধ থাকায় স্থানীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দেও বেনগেয়া বলেন, ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে পুঁজির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না।
একজন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কঙ্গোর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সঞ্চয়কারীদের বিপুল অর্থ ঝুঁকিতে ফেলার ভয়েই ব্যাংকগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এর মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এম২৩ নেতৃত্ব দাবি করছে, জনগণের সঞ্চয় আটকে রাখা যুদ্ধাপরাধের শামিল। অন্যদিকে কঙ্গোর সরকার এই অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের দাবি, কোনো সরকারি আদেশে ব্যাংক বন্ধ হয়নি এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যাংকের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক দুরবস্থার পাশাপাশি গোমার মানুষ শান্তি নিয়েও বিভক্ত। এম২৩ বলছে, তারা শহরে নিরাপত্তা ও মৌলিক সেবা নিশ্চিত করেছে। অনেক বাসিন্দা বলছেন, এখন রাতে শান্তিতে ঘুমানো যায়, পানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ আগের চেয়ে স্থিতিশীল।
তবে সবাই একমত নন। কেউ কেউ মনে করেন, বাস্তবে তেমন পরিবর্তন হয়নি এবং এম২৩কে তাদের শাসনব্যবস্থার ভিন্নতা প্রমাণ করতে হবে। অনেকেই চান, সব পক্ষের শান্তি উদ্যোগ সফল হোক এবং স্থায়ী শান্তি ফিরে আসুক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় শান্তি চুক্তি হলেও পূর্ব কঙ্গোর মানুষের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। গোমার বাসিন্দা ডেভিড লিন্ডা বলেন, নিরাপত্তা কিছুটা এলেও মানুষ ক্ষুধার্ত। অস্ত্র নীরব, কিন্তু খাবার নেই।
এক বছর পরও শেইলা জাওয়াদির মতো ব্যবসায়ীরা বিকল্প পথে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। মোবাইল ও অনলাইন লেনদেনে টাকা পেলেও নগদ তুলতে এখনো রুয়ান্ডা যেতে হয়, প্রতিবারই ক্ষতির হিসাব মেনেই। ব্যাংক না খোলা পর্যন্ত এভাবেই অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকতে হচ্ছে গোমার মানুষকে।
















