উৎপাদন না বাড়লেও খরচ বেড়েছে ৮ শতাংশ; অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে বছরে অপচয় হচ্ছে ১৫ হাজার কোটি টাকা
সাশ্রয়ী নীতির মধ্যেও দেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন খরচ ও কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ সত্ত্বেও গত এক বছরে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বাবদ সরকারের ব্যয় বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে মোট কেন্দ্রভাড়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকায়। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাসের তীব্র সংকট এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ১২ টাকা ৩৪ পয়সায় ঠেকেছে। সম্প্রতি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশে প্রয়োজনের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বসিয়ে রাখা হয়েছে, যার পেছনে বছরে ৯২০ থেকে ১৫০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ‘ভাড়া’ হিসেবে গচ্চা দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত সরকারের আমলে করা এসব ‘লুণ্ঠনমূলক’ চুক্তি দ্রুত পুনর্বিবেচনা না করলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি জানিয়েছে, একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে দরপত্র ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে অসম চুক্তি করা হয়েছে, যার খেসারত দিচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণ ও পিডিবি।
ভাড়ার অঙ্কে লাফ: ৪২ হাজার কোটির ফাঁদ
পিডিবি’র পরিসংখ্যান বলছে, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সংকটে অনেক কেন্দ্র অলস বসে আছে। তবুও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের ভাড়া দিতে হচ্ছে:
- ২০২২-২৩ অর্থবছর: বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা।
- ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার কোটি টাকায়।
- ২০২৪-২৫ অর্থবছর: ১০টি কেন্দ্রের চুক্তি বাতিল সত্ত্বেও সক্ষমতা অনুযায়ী ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা।
উৎপাদন খরচ বাড়ার তিন নেপথ্য কারণ
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতে, খরচ বাড়ার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করেছে:
১. ডলারের বিনিময় হার: বেসরকারি খাতের ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল ডলারে হিসাব করা হয়। ডলারের দাম ১১০ টাকা থেকে ১২২ টাকায় ওঠায় পিডিবির খরচ বহুগুণ বেড়েছে।
২. জ্বালানি মিশ্রণে পরিবর্তন: সস্তার গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় (৪৮% থেকে ৪৪%) ব্যয়বহুল কয়লা (২০% থেকে ২৭%) ও তেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কয়লায় বিদ্যুতের দাম গ্যাসের তুলনায় দ্বিগুণ।
৩. বিপিসির অতিরিক্ত মুনাফা: বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পিডিবি থেকে লিটার প্রতি ৮৬ টাকা নিচ্ছে, যেখানে বেসরকারি খাত ৭০ টাকায় তেল কিনছে।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:
- দেশে বর্তমানে ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ‘অলস সক্ষমতা’ রয়েছে।
- ১২ বছরের মধ্যে প্রকল্পের ঋণ শোধ হয়ে গেলেও চুক্তির মারপ্যাঁচে ১৩ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত উচ্চহারে ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
- ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম একে ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, সরকার দায়মুক্তি আইন বাতিল করলেও চুক্তিগুলো আগের মতোই বহাল রেখেছে, যা ব্যয় কমানোর পথে বড় বাধা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, চুক্তিগুলো পুনরায় দরকষাকষির জন্য বিশেষ কমিটি কাজ করছে। যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে সরাসরি চুক্তি বাতিল করা হবে। ইতোমধ্যে মাতারবাড়ীসহ কয়েকটি বড় কেন্দ্রে ট্যারিফ সমন্বয় এবং সার্ভিস চার্জ কমিয়ে বছরে প্রায় ৯ হাজার ২১০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২.৩৪ টাকায় উৎপাদন করে গ্রাহক পর্যায়ে ৭.০৪ টাকায় বিক্রি করছে, ফলে সরকারকে বছরে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।















