দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের টানা–বিরতিহীন আলোচনার পর ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যচুক্তি ঘোষণা করতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে উভয় পক্ষ পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে এই চুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভারতের বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগারওয়াল সোমবার জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার সব ধাপ সম্পন্ন হয়েছে এবং চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা দিল্লিতে অবস্থান করছেন। তাদের সফরকালেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ ও শুল্কনীতি ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে বিকল্প অংশীদার খুঁজছে। এরই অংশ হিসেবে এই চুক্তিকে কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর পঞ্চাশ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় দিল্লির ওপর চাপ বেড়ে যায়। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকির মুখে পড়ে, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মতবিরোধের কারণে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট কস্তা বলেন, এই চুক্তি বিশ্ববাসীর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দেবে যে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুল্কের বদলে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে বিশ্বাস করে। অন্যদিকে উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেছেন, ইউরোপ ও ভারত একসঙ্গে কাজ করে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার রূপরেখা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সোমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় নেতারা প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন। মঙ্গলবার তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। ওই বৈঠকের পরই চুক্তির ঘোষণা আসতে পারে। তবে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও কাউন্সিলের অনুমোদনের পর চলতি বছরের শেষ দিকে চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই চুক্তির ফলে ইউরোপের বাজারে ভারতের রপ্তানি বাড়বে এবং একই সঙ্গে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও পণ্য, যেমন গাড়ি ও পানীয়, ভারতের বাজারে প্রবেশ সহজ হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বক্তব্যে বলেন, এই চুক্তি বিশ্বের দুই বড় অর্থনীতির অংশীদারত্বের উদাহরণ, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক–তৃতীয়াংশকে প্রতিনিধিত্ব করে।
বর্তমানে পণ্য বাণিজ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের সবচেয়ে বড় অংশীদার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দুই পক্ষের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত এক দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
২০০৭ সালে প্রথম ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে এই চুক্তির আলোচনা শুরু হলেও বাজারে প্রবেশাধিকার ও নীতিগত জটিলতার কারণে ২০১৩ সালে তা থেমে যায়। পরে ২০২২ সালের জুলাইয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু হয়। গাড়ি, কৃষিপণ্য ও কার্বন সংক্রান্ত শুল্ক ছিল প্রধান বাধা, যা নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে কী সিদ্ধান্ত এসেছে তা নিয়ে বিশ্লেষকদের আগ্রহ রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত যুক্তরাজ্য, ওমান ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বড় বাণিজ্যচুক্তি করেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য জোটের সঙ্গে করা চুক্তিও কার্যকর হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও দীর্ঘ ২৫ বছরের আলোচনার পর দক্ষিণ আমেরিকার একটি বাণিজ্য জোটের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন চুক্তি বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান আরও শক্ত করবে এবং বর্তমান অনিশ্চিত বিশ্ব অর্থনীতিতে উভয় পক্ষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
















