মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ মন্দাই প্রধান বাধা; ব্যাংক সংস্কার ও রিজার্ভ সুরক্ষায় কঠিন পরীক্ষার মুখে দেশ
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার আগে দেশের অর্থনীতির এমন এক চিত্র রেখে যাচ্ছে, যা একাধারে সংস্কারের আলো আর বহুমুখী সংকটের আঁধারে ঘেরা। গত ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের লিকেজগুলো বন্ধ করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার সফল হলেও, সাধারণ মানুষের প্রধান কষ্ট ‘মূল্যস্ফীতি’ নিয়ন্ত্রণে এবং বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ সৃষ্টিতে তারা আশানুরূপ ফল দেখাতে পারেনি। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকায়। এমতাবস্থায় নতুন সরকারকে কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই নয়, বরং আইএমএফ-এর কঠিন শর্ত এবং ভঙ্গুর ব্যাংক খাতকে পুনর্গঠন করার মতো অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির ‘ক্ষত’ সারাতে কাজ শুরু করলেও তার পূর্ণ সুফল পাওয়ার দায়িত্ব এখন নতুন সরকারের কাঁধে।
অর্থনীতির বর্তমান স্বাস্থ্য: অর্জন ও ব্যর্থতা
বিগত দেড় বছরে অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও অনেক ক্ষেত্রে স্থবিরতা রয়ে গেছে:
- সফলতা: টাকা পাচার ও হুন্ডি রোধে কড়াকড়ি আরোপের ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আগের সরকারের বকেয়া বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করে আইসিসি এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
- ব্যর্থতা: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আশঙ্কাজনক হারে কমে জুলাই-সেপ্টেম্বরে মাত্র ১৪ কোটি ডলারে ঠেকেছে। ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না।
নতুন সরকারের জন্য ৭টি ‘অগ্নিপরীক্ষা’
আগামী মাসগুলোতে নতুন সরকারকে যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে:
১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: ২০২২ থেকে চলা চড়া মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৮.৪৯ শতাংশে। রমজান ও ঈদের বাড়তি চাহিদায় এটি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: তরুণ প্রজন্মের ৯৫ শতাংশ বেসরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল। শিল্প খাতে আস্থা না ফিরলে বেকারত্ব সংকট প্রকট হবে।
৩. ব্যাংক খাতের সংস্কার: ৬.৪৫ লাখ কোটি টাকার বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝা কমানো এবং বড় ব্যবসায়ীদের চাপ সামলে ব্যাংক কোম্পানি আইন বাস্তবায়ন করা।
৪. রাজস্ব ঘাটতি: ৪৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি আবারও টাকা ছাপানো শুরু করে, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
৫. আইএমএফ-এর শর্ত: ডলারের দাম বাড়ানো এবং জ্বালানি-বিদ্যুতের ভর্তুকি কমানোর মতো আইএমএফ-এর কঠোর শর্তগুলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
৬. আইনশৃঙ্খলা ও মব কালচার: শিল্পাঞ্চলে হামলা ও অস্থিরতা বন্ধ করে উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৭. রপ্তানি বাজার: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সচল রাখতে বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতা।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “বর্তমান সরকার লিকেজ বন্ধ করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু নতুন বিনিয়োগ টানতে পারেনি। নতুন সরকারকে রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।”
অন্যদিকে, অধ্যাপক মইনুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা বিনিয়োগের প্রধান শত্রু। নতুন সরকারকে মব সৃষ্টিকারী মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, অন্যথায় বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।”
“বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে, জনগণের কাছে সরকারের দাম কমে”—এই প্রবাদটি নতুন সরকারের জন্য বড় সতর্কবাণী। সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া সাধারণ মানুষ এখন স্বস্তি চায়। নতুন সরকার কি সংস্কারের কঠিন পথে হাটবে, নাকি জনতুষ্টির সস্তা জনপ্রিয়তায় গা ভাসাবে—তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
















