স্কটল্যান্ডের জাতীয় কবি রবার্ট বার্নসের রচিত ট্যাম ও’শ্যান্তার এমন একটি কবিতা, যার সঙ্গে তুলনা করার মতো আর কোনো রচনা স্কটিশ সাহিত্যে নেই বলে মনে করেন গবেষকরা। ডাইনি, মদ্যপান ও ভয়াল কল্পনার রোমাঞ্চকর গল্পের আড়ালে মানবস্বভাব, সমাজ ও নৈতিকতার গভীর বিশ্লেষণ লুকিয়ে আছে এই কবিতায়। ১৭৯১ সালে প্রথম প্রকাশের ২৩৫ বছর পরও এটি পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
প্রতি বছর ২৫ জানুয়ারি রবার্ট বার্নসের জন্মদিন উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বার্নস স্মরণানুষ্ঠান। এই আয়োজনে স্কটিশ ঐতিহ্যবাহী খাবার, পানীয় এবং কবির বিখ্যাত গান ও কবিতা আবৃত্তি করা হয়। এই তালিকায় প্রায়ই থাকে ট্যাম ও’শ্যান্তার, যা বহু মানুষের কাছে নিছক রোমাঞ্চকর গল্প হিসেবে পরিচিত হলেও সাহিত্য বিশ্লেষকদের মতে এর তাৎপর্য আরও অনেক গভীর।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট বার্নস গবেষণার অধ্যাপক পলিন ম্যাকে বলেন, ট্যাম ও’শ্যান্তারই বার্নসের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এটি তার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতাগুলোর একটি হলেও দীর্ঘ গবেষণায় দেখা যায়, কবিতাটি বহুস্তরবিশিষ্ট। এতে বার্নস মানুষের অনুপ্রেরণা, আকাঙ্ক্ষা এবং মানব প্রকৃতি সম্পর্কে নিজের উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন।
কবিতাটির গল্প ঘুরে ফিরে এক কৃষক ট্যাম ও’শ্যান্তারকে কেন্দ্র করে। কাজের চেয়ে মদ্যপানে বেশি আগ্রহী এই মানুষটি একদিন বাজার শেষে বন্ধুর সঙ্গে পানশালায় বসে দীর্ঘ সময় কাটায়, যদিও বাড়িতে তার স্ত্রী অপেক্ষা করছিলেন। গভীর রাতে ঝড়ের মধ্যে ঘোড়ায় চড়ে ফেরার পথে সে এক পরিত্যক্ত গির্জায় ভয়ংকর দৃশ্যের মুখোমুখি হয়। সেখানে ডাইনি ও জাদুকরেরা নাচছে, আর শয়তান নিজে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে।
এই ডাইনিদের মধ্যেই এক তরুণী ডাইনির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ট্যাম চিৎকার করে ওঠে, যা পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় শ্বাসরুদ্ধকর ধাওয়া। নদীর সেতু পার হয়ে ট্যাম প্রাণে বাঁচলেও তার ঘোড়ার লেজ ছিঁড়ে যায়। হাস্যরস ও আতঙ্ক একসঙ্গে মিশে আছে এই অংশে।
গবেষকদের মতে, কবিতাটি শুধু ভূতের গল্প নয়। এতে স্কটল্যান্ডের লোককথা, প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানব সম্পর্ক ও লিঙ্গ রাজনীতির সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে। স্কটিশ ভাষা ও ইংরেজি ভাষার মিশ্রণে লেখা এই কবিতায় রয়েছে অশ্লীল কৌতুক, আবার রয়েছে মৃত্যুভাবনা ও দর্শনচিন্তা। কোথাও জীবনের ক্ষণস্থায়ী আনন্দের প্রশংসা, আবার কোথাও সেই আনন্দের অনিত্যতার বেদনা ফুটে উঠেছে।
বার্নস নিজেই কখনো পাঠককে, কখনো চরিত্রকে সম্বোধন করে কবিতাটি এগিয়ে নিয়েছেন, যা একে মঞ্চে আবৃত্তির জন্য বিশেষ উপযোগী করে তুলেছে। ছন্দ, গতি ও ভাষার নৈপুণ্যে কবিতাটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট বার্নস বিষয়ক এক গবেষক বলেন, ট্যাম ও’শ্যান্তার আসলে মানবজাতির প্রতিচ্ছবি। এখানে ট্যাম একজন সাধারণ মানুষ, যার ভেতর দুর্বলতা, লোভ, আনন্দ ও ভুল সিদ্ধান্ত সবই আছে। বার্নস এই চরিত্রকে একই সঙ্গে বিদ্রূপ ও মমতার চোখে দেখেছেন।
অনেকে মনে করেন, কবিতাটির মধ্যে আরও এক ধরনের অস্বস্তিকর ইঙ্গিত রয়েছে। বার্নসের পিতা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এবং ছেলের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। সেই পিতার সমাধিস্থল হিসেবে পরিচিত গির্জাকেই বার্নস কবিতায় ডাইনিদের নৃত্যের স্থান হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা ব্যক্তিগত বিদ্রোহের প্রতীক বলেও ব্যাখ্যা করা হয়।
সব মিলিয়ে ট্যাম ও’শ্যান্তার শুধু একটি ভৌতিক বা হাস্যরসাত্মক কবিতা নয়। এটি মানুষের প্রবৃত্তি, দুর্বলতা ও আনন্দের জটিল মিশ্রণকে তুলে ধরা এক অনবদ্য সাহিত্যকর্ম। এই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও কবিতাটি নতুন করে পাঠ ও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
















