নির্বাচন-পরবর্তী রমজান, বাড়তি ব্যয় ও বিনিয়োগ স্থবিরতায় চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, তাদের জন্য দেশ পরিচালনা—বিশেষ করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা—হবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন, বিপুল রাজস্ব ঘাটতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ে শুরু করতে হবে নতুন সরকারের যাত্রা।
নির্বাচনের পরপরই রমজান ও ঈদুল ফিতর সামনে আসায় বাজার নিয়ন্ত্রণ হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু মৌসুমি চাপ নয়; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা, কম বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি এবং বাড়তে থাকা সরকারি ব্যয়ের সম্মিলিত ফল।
অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম শেষ না করেই দায়িত্ব ছাড়ছে। এসব অসমাপ্ত সংস্কার থেমে গেলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে। বছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। পুরো কাঠামো বাস্তবায়নে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এতে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে। দেশে এমনিতেই কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
ব্যাংক খাতেও আস্থা সংকট কাটেনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। কৃষি খাতে উৎপাদন তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও শিল্প খাতের অবস্থা নাজুক। গত ১৪ মাসে বহু কারখানা বন্ধ হয়েছে, লাখো মানুষ বেকার হয়েছেন এবং নতুন বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়েও চরম স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ—দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা আবার মাথাচাড়া দিলে সামষ্টিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই নতুন করে বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, প্রকৃত আয় বাড়বে না এবং বৈষম্য আরও গভীর হবে।
তার মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, উচ্চ সুদহার, কর ব্যবস্থার চাপ, জ্বালানি সংকট এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। এসব সংকট নিয়েই নতুন সরকারকে পথচলা শুরু করতে হবে—যা মোটেও সহজ হবে না।
















