১৮ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে শুক্রবার অনুষ্ঠিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। আয়োজকেরা একে ‘জাতীয় ঐক্যের দলিল’ হিসেবে তুলে ধরলেও, সমালোচকেরা বলছেন—এটি মূলত প্রতীকী এক রাজনৈতিক প্রদর্শন।
২৫টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিভিন্ন বিরোধী জোটের নেতারা। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই আয়োজনে অংশ নেয়নি, এবং সনদটিকে ‘জাতীয় ঐক্য নয়’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে এক অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন,
“শুধু কয়েকটা রাজনৈতিক দল এক টেবিলে বসলে জাতীয় ঐক্য হয়ে যায় না। আজকেও জুলাই সনদ নামে একটা সনদে কিছু রাজনৈতিক দল একত্র হয়ে স্বাক্ষর করবে। তারা এটিকে জাতীয় ঐক্য নামে আখ্যা দিতে চায়। এটা কোনো ঐক্য নয় বলে আমরা মনে করি।”
এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের দৃষ্টিতে এই সনদ আইনি ভিত্তি বা কাঠামোগত বৈধতা অর্জন করেনি, তাই দলটি এতে অংশ নেয়নি। দলের যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেল সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন বলেন,
“যেহেতু এ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আইনি ভিত্তি অর্জন হবে না, এটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা। আমরা বহুবার আইনি ভিত্তির কথা বলেছি, তাই এখানে অংশ নিচ্ছি না।”
তবে তিনি জানান, ঐকমত্য কমিশনের সময় বৃদ্ধি হওয়ায় এনসিপি ভবিষ্যতে আলোচনায় অংশ নেবে এবং দাবি পূরণ হলে স্বাক্ষর করতেও পারে।
🔹 কারা স্বাক্ষর করেছেন
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ২৫টি রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, এলডিপি, এনডিএম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতা।
তারা সবাই শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ স্বাক্ষর করেন।
🔹 ঐক্যের প্রচেষ্টা নাকি রাজনীতির কৌশল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
‘জুলাই সনদ’ বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতিতে একটি নতুন সমন্বয়ের প্রচেষ্টা, যা রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে ঐক্যের বার্তা দিতে চায়।
তবে বিশ্লেষকরা এটিকে নিছক রাজনৈতিক কৌশল বা প্রতীকী ঐক্য হিসেবেও দেখছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগীয় অধ্যাপক ড. ফারজানা রহমান বলেন,
“এটি রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর একটি উদ্যোগ—বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতি। কিন্তু যে দলগুলো এতে স্বাক্ষর করেনি, তাদের অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে ঐক্য এখনো আংশিক।”
অন্যদিকে, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ ইমতিয়াজ করিম মনে করেন,
“জুলাই সনদে নীতিগত ঐক্যের ঘোষণা থাকলেও, বাস্তব রাজনৈতিক কাঠামো ও আইনি সংজ্ঞা অনুপস্থিত। তাই এটি নৈতিক বার্তা হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু কার্যকর দলিল হিসেবে গতি পাবে না।”
🔹 আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
‘অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য’ ঢাকায় অবস্থানরত এক ইউরোপীয় কূটনীতিক মন্তব্য করেন,
“যে কোনো সংলাপ বা সমঝোতার প্রচেষ্টা ইতিবাচক। তবে টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য অন্তর্ভুক্তি ও আইনি স্বীকৃতি অপরিহার্য।”
জাতিসংঘের রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটর অফিস এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানায়, তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে “বিস্তৃত ভিত্তির সংলাপ ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথ” অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাচ্ছে।
দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিক মহলেও তুলনা টানা হচ্ছে নেপাল ও পাকিস্তানের অতীত রাজনৈতিক সমঝোতা প্রচেষ্টার সঙ্গে—যেখানে ঐক্যের ঘোষণা হলেও বাস্তব ফলাফল তেমন দেখা যায়নি।
🔹 সামনে পথ কোথায়?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির এক নতুন অধ্যায় খুলেছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে—এই ঐক্য কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি তা বাস্তবে অংশগ্রহণমূলক ও আইনি প্রক্রিয়ায় রূপ পাবে।
এক প্রবীণ কূটনীতিকের ভাষায়,
“বাংলাদেশে এখন নতুন ঘোষণা নয়, দরকার নতুন আস্থা। আর সেই আস্থা আসবে তখনই, যখন ভিন্নমত পোষণকারীরাও একই টেবিলে বসবে।”
‘জুলাই সনদ’ রাজনৈতিক বিরোধীদের একত্রে আনার প্রয়াস হলেও, এতে অনুপস্থিত দলগুলোর অংশগ্রহণ ও আইনি ভিত্তি ছাড়া এই ঐক্য পূর্ণতা পাবে না। অতএব, এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক কিন্তু তার পরিণতি এখনো নির্ভর করছে আলোচনার ধারাবাহিকতার ওপর।
















