“পৃথিবীর স্বর্গ” নামে পরিচিত জম্মু ও কাশ্মির হাজার বছরের ইতিহাসে ছিল নানাধর্মী সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার মিলনভূমি। প্রাচীনকাল থেকেই এই উপত্যকা নানা ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির সহাবস্থানের প্রতীক হলেও, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদেশি দখল তার ঐতিহ্যকে ক্ষয় করছে। একসময় যে অঞ্চল ছিল পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির প্রতীক, আজ সেই কাশ্মির লড়ছে নিজের ইতিহাস ও পরিচয় রক্ষার সংগ্রামে।
ঐতিহাসিক পণ্ডিত কলহন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রাজতরঙ্গিনী (রাজাদের নদী)-তে উল্লেখ করেছেন যে কাশ্মিরের ইতিহাস প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো। এর উৎপত্তি জড়িত আছে বহু মিথ, ভাষাগত ব্যাখ্যা ও উপজাতিগত ইতিহাসের সঙ্গে। হিন্দু পুরাণে বলা হয়, কাশ্মির একসময় ছিল এক বিশাল হ্রদ— “সতী সর”— যা ঋষি কাশ্যপ শুকিয়ে দেন। তাঁর বংশধরেরাই পরে এই ভূমিকে “কাশ্যপ মার” বা “কাশ্যপের দেশ” নামে অভিহিত করেন। মুসলিম কাহিনিতেও অনুরূপ গল্প পাওয়া যায়— বলা হয়, নবী সোলায়মান এক জিন “কাশ্যপ”-কে আদেশ দেন এক সুন্দর হ্রদ শুকিয়ে সেখানে বসতি স্থাপনের জন্য, এবং সেই স্থানই পরে “কাশ্যপ-মীরা” থেকে “কাশ্মির”-এ রূপ নেয়।
ভাষাবিদদের মতে, “কাশ্মির” শব্দটি এসেছে “কাশ” (জলধারা) ও “মীর” (পর্বত) শব্দ থেকে, যার অর্থ “পর্বত ও নদীনালা বেষ্টিত ভূমি”। আবার ইতিহাসবিদরা মনে করেন, “কাশ” বা “খাসা” নামের এক প্রাচীন উপজাতির বসতি থেকেই এ নামের উৎপত্তি— হিমালয় অঞ্চলের অনেক স্থানের নামই এভাবে উপজাতির নাম থেকে এসেছে।
ইতিহাস জুড়ে ভিন্ন ভিন্ন ভ্রমণকারী কাশ্মিরকে নানা নামে অভিহিত করেছেন। চীনা ভ্রমণকারী সুং-ইউয়ান একে বলেছেন “শি-ই-মি,” হিউয়েন সাং উল্লেখ করেছেন “কিয়া-শি-মি-লো” নামে। তিব্বতীয়রা একে ডাকত “খাচুল,” দার্দিস্তানের লোকেরা বলত “কাশরাত,” গ্রিকরা বলত “কাশপেরিয়া,” আর স্থানীয়রা একে “কাশির” বা “কাশীর” নামে চিনত। ইউরোপে “ক্যাশমেয়ার” নামটি বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তার ঐতিহ্যবাহী পশমি শালের জন্য।
ভূতাত্ত্বিক গবেষণায়ও প্রমাণ মিলেছে যে কাশ্মির একসময় জলের নিচে ছিল। বিজ্ঞানী ড্রিউ ও অস্টিনের মতে, প্রায় ২০–২৫ কোটি বছর আগে এই উপত্যকা ছিল এক বিশাল হ্রদ বা সাগর, যা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে পরিবর্তিত হয়। শংকরাচার্য ও হরিপার্বত পাহাড় সেই প্রাচীন ভৌগোলিক পরিবর্তনের নিদর্শন বহন করছে। উপত্যকার সমতল ভূমি, যাকে স্থানীয়ভাবে “কারেওয়া” বলা হয়, সেই প্রাচীন হ্রদের তলদেশের নিঃশেষিত পলি থেকে গঠিত, যা আজও কৃষির জন্য উর্বর ভূমি হিসেবে পরিচিত।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঋষি, পণ্ডিত, রাজা ও পর্যটকেরা এই ভূমিকে সমৃদ্ধ করেছেন। স্থাপত্য, ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাদের প্রভাব আজও অটুট। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে চলমান সংঘাত ও দখলদারিত্ব সেই ঐতিহ্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে কাশ্মির অব্যাহত দখল ও সহিংসতার শিকার, যার ফলে এর সমাজ ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য হারাচ্ছে দীপ্তি।
গত ৭৮ বছর ধরে ভারত কাশ্মিরের দখল ধরে রেখেছে, এবং বিজেপির হিন্দুত্ববাদী নীতির আওতায় সেখানে সাংস্কৃতিক ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কাশ্মিরের জনবিন্যাস বদলানো, পরিচয় মুছে ফেলা এবং ঐতিহ্য ধ্বংসের চেষ্টা চলছে পরিকল্পিতভাবে। তবুও কাশ্মিরিয়ত — সহনশীলতা, মানবতা ও মিলনমুখী সংস্কৃতির চেতনা — আজও কাশ্মিরিদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে আছে।
ভারতের এই দখলদার নীতি এখন কাশ্মিরিয়ত মুছে ফেলার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংঘাত শুধু প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে না, বরং হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভিত্তি ধ্বংস করছে। আজ কাশ্মির কেবল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নয়, বরং নিঃশব্দে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ইতিহাসেরও প্রতীক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনই উদ্যোগ নিতে হবে কাশ্মিরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায়। ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতির এই সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার যদি এখন সংরক্ষিত না হয়, তবে তা ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে চিরতরে। কাশ্মিরের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করা এখন বৈশ্বিক মানবিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
















