ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অস্থিরতা ও প্রতিশোধমূলক রাজনীতিই আলোচনার কেন্দ্র ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারা থেকে সরে এসে কে শাসন করবে নয়, বরং দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে সে প্রশ্নটি সামনে এসেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত পলিসি সামিট ২০২৬ সেই পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই ইঙ্গিত দেয়।
সম্মেলনে প্রচলিত স্লোগানের বদলে শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথা তুলে ধরা হয়। দক্ষ জনশক্তি তৈরি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, بيرোক্র্যাটিক জটিলতা কমানো এবং প্রবাসী মেধা কাজে লাগানোর প্রস্তাবগুলো আধুনিক উন্নয়ন অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। মানবসম্পদে বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সামিটে বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দক্ষতার অসামঞ্জস্য, আর্থিক অপচয় ও দুর্নীতির কথা বলা হয়। দুর্নীতিকে শুধু নৈতিক সমস্যা নয়, বরং ব্যবস্থাপনাগত সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এ কারণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল রূপান্তর ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইসিটি নীতিতে ঘুষ কমাতে জিরো ক্যাশ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসে। সরকারি সেবায় একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার কথা বলা হয়, যার নাম দেওয়া হয়েছে গভইন্টেল সিস্টেম। সব সরকারি ক্রয়ে ই টেন্ডার বাধ্যতামূলক করা এবং আয়কর রিটার্নে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে কর ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত হয়। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে মত দেওয়া হয়।
সম্মেলনের অন্যতম নতুন ধারণা স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড। এতে এনআইডি, টিআইএন ও স্বাস্থ্য তথ্য একত্রিত থাকবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত সহজ হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দুর্নীতি ও অপচয় কমানো সম্ভব হবে। গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দুর্বল ডাটাবেসের কারণে বর্তমানে অনেক ভাতা ভুল মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। একটি সমন্বিত ডিজিটাল কার্ড চালু হলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমবে।
যুব নীতিতে প্রস্তাব করা হয়েছে, চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত পাঁচ লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েটকে মাসিক দশ হাজার টাকা সুদমুক্ত সহায়তা দেওয়া হবে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত। পাশাপাশি এক লাখ শিক্ষার্থীকে শিক্ষা ঋণ দেওয়ার কথাও বলা হয়। এতে তরুণরা অযোগ্য কাজে না গিয়ে দক্ষতার সঙ্গে মানানসই চাকরি খুঁজতে পারবে বলে মত দেওয়া হয়। আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বড় অংশ আইসিটি খাতে যুক্ত হবে। এছাড়া যুব জব ব্যাংক ও স্কিল ম্যাপিং ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিল্প ও জ্বালানি নীতিতে বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবন করে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি তিন বছর শিল্প খাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম না বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। এতে বিনিয়োগ পরিকল্পনা সহজ হবে এবং উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ সফল করতে শক্তিশালী আইনগত কাঠামো ও পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রো বাংলাদেশ নীতি এবং নিয়মভিত্তিক অর্থনীতির রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমিয়ে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়। প্রতিটি উপজেলা উন্নয়ন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে ঢাকামুখী চাপ কমানো এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত নীতিগুলো বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। কর ও ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব দিলে রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে কর জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে কম। তাই করহার কমানোর পাশাপাশি করজাল সম্প্রসারণ জরুরি বলে মত দেওয়া হয়। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বড় অংশ বরাদ্দ দেওয়ার আগে ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবাসী গবেষক ও পেশাজীবীদের দেশে ফিরিয়ে মেধা বিনিয়োগ বাড়ানোর ধারণাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়। পাশাপাশি নারীদের কর্মজীবনে ফেরাতে রি এন্ট্রি সুবিধা ও নমনীয় কর্মঘণ্টার প্রস্তাব এসেছে, যাতে দক্ষ নারী জনশক্তি অর্থনীতিতে আবার যুক্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে পলিসি সামিট ২০২৬ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে এসে তারা উন্নয়নভিত্তিক একটি রূপরেখা তুলে ধরেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ও ডিজিটাল সুশাসনের কথা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক গতিপথ বদলে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
















