গোপালগঞ্জ থেকে এএফপি জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উৎখাতের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। তবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ। দীর্ঘদিন যে দল তাদের রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্র ছিল, সেই দল ছাড়া ভোটে অংশ নেওয়া নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন অনেকেই।
রাজধানী ঢাকার দক্ষিণে অবস্থিত গোপালগঞ্জ ছিল শেখ হাসিনার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কয়েক দশক ধরে এখানকার রাজনীতি আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। এবার সেই গোপালগঞ্জেই ভোট আসছে ভিন্ন বাস্তবতায়। বহু মানুষ বুঝে উঠতে পারছেন না, কার পক্ষে ভোট দেবেন বা আদৌ ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি না।
রিকশাভ্যান চালক মোহাম্মদ শাহজাহান ফকির বলেন, শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠরা ভুল করে থাকতে পারেন, কিন্তু লাখ লাখ আওয়ামী সমর্থকের কী দোষ। তিনি জানান, এবার তিনি ভোট দেবেন না। তার প্রশ্ন, ব্যালটে নৌকা প্রতীক কেন থাকবে না।
১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় ভোট। ওই সময় ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা ও আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়নের পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরে ঢাকার আদালত তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং তার দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
গোপালগঞ্জে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। কলা ও পান বিক্রেতা মোহাম্মদ শাফায়েত বিশ্বাস বলেন, চারদিকে ভীষণ বিভ্রান্তি। কয়েকজন প্রার্থী দাঁড়ালেও তিনি তাদের চেনেন না। এক সমাবেশে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এবার কাদের ভোট দেওয়া হবে।
শেখ হাসিনার বাবা ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তার ভাস্কর্য ভাঙচুর হলেও গোপালগঞ্জে এখনও সেগুলো সংরক্ষিত রয়েছে। তবে হাসিনার পতনের পর এখানে রাজনৈতিক সহিংসতাও হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রচারণাকালে পুলিশ ও আওয়ামী সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। পরে আট হাজারের বেশি মামলা দেওয়া হয় স্থানীয়দের বিরুদ্ধে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী মনে করেন, গোপালগঞ্জে ভোটার উপস্থিতি দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম হতে পারে। তার মতে, অনেক মানুষ এখনও মানতে চান না যে শেখ হাসিনা বড় ভুল করেছিলেন। একই সঙ্গে সরকারও তাদের প্রতি কঠোর মনোভাব দেখিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এবার নির্বাচনে সামনে থাকা প্রার্থীরা মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী থেকে। তারা শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। বিএনপি প্রার্থী এস এম জিলানী জানান, তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন, কারণ অনেক ভোটার আগে কখনও প্রার্থীদের কাছ থেকে সরাসরি প্রচারণা দেখেননি। তিনি বলেন, আগে রাজনৈতিক মামলায় তাকে কোণঠাসা করা হয়েছিল। এবারও ভোটারদের কেন্দ্রে না যেতে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াত প্রার্থী এম এম রেজাউল করিম বলেন, হাসিনার সময়ে তাদের দল কার্যত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল। তার মতে, মানুষ নেতৃত্বে পরিবর্তন চায়। তিনি জানান, যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার হওয়া উচিত, তবে সাধারণ মানুষকে ছাড় দিতে হবে।
একসময় যারা শেখ হাসিনার প্রতি অনুগত ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন হতাশ। কেউ কেউ আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিলেও নতুন করে কাকে সমর্থন করবেন তা ঠিক করতে পারছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, তিনি ভোট দেবেন না। তার ভাষায়, হাসিনাই ছিলেন তার কাছে সবচেয়ে কাছের নেতা, অন্য কাউকে ভোট দেওয়ার কথা তিনি ভাবতেই পারছেন না।
















