নিরাপত্তা অজুহাতে কূটনীতিক পরিবারের সদস্য প্রত্যাহার, ঢাকার পক্ষ থেকে এখনই পাল্টা পদক্ষেপ নয়
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় মিশনগুলো থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের ধাপে ধাপে ফিরিয়ে নিচ্ছে ভারত। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের একাধিক কূটনীতিক বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তাদের ভাষ্য, ‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় কূটনীতিকরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি। ঢাকায় ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ, হাইকমিশন ঘেরাওয়ের হুমকি এবং চট্টগ্রামে সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনাকে তারা বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এমন পরিস্থিতিতে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশে রাখা সমীচীন নয়—এমন মূল্যায়নের কথাও জানান তারা।
দিল্লির ব্যাখ্যা, ঢাকার অবস্থান
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের এক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের কূটনৈতিক স্থাপনা, কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই মিশন ও পোস্টগুলোতে পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা কমানো হচ্ছে।’ তবে তিনি জানান, এতে ভারতের কূটনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে না এবং হাইকমিশন ও চারটি সহকারী হাইকমিশন পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে।
হাইকমিশনের একটি সূত্র জানায়, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার **প্রণয় ভার্মা**সহ কয়েকজন শীর্ষ কূটনীতিকের স্ত্রী বা স্বামীরা বাংলাদেশে অবস্থান করবেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—ভারতের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন কোনো পরিস্থিতি আমরা দেখছি না, যাতে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশ ছাড়তে হবে। ভারতের যদি নির্দিষ্ট কোনো উদ্বেগ থাকে, সেটি তারা স্পষ্ট করলে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।’
ভারতের এই সিদ্ধান্তের পাল্টা জবাব হিসেবে বাংলাদেশও কি একই ধরনের পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রশ্নে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ মুহূর্তে এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।’
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা দেখানো অনেক দেশই করে থাকে। গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি সন্তোষজনক ছিল না, বিশেষ করে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন শেষে পরিস্থিতি উন্নত হলে এই উদ্বেগও কমে আসতে পারে।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘তড়িঘড়ি করে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভারতের নির্দিষ্ট উদ্বেগের জায়গাগুলো বুঝে নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পথ খোঁজা উচিত।’
সম্পর্কের প্রেক্ষাপট
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে। ঢাকায় ভারতীয় স্থাপনায় হামলা ও হুমকির পাশাপাশি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ, আগরতলায় সহকারী হাইকমিশনে হামলা—উভয় পক্ষের জন্যই সম্পর্ককে জটিল করেছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-র মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এলেও সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ইস্যু নতুন করে টানাপোড়েন বাড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় মিশনগুলোতে ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ কার্যকর হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল বাস্তবতাকেই সামনে আনছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
















